পাকিস্তানের তালেবান ভরসা ভুল প্রমাণিত: আফগানিস্তানে বিমান হামলা ও সীমান্ত সংঘর্ষ
পাকিস্তানের তালেবান ভরসা ভুল প্রমাণিত, আফগানিস্তানে হামলা

পাকিস্তানের তালেবান ভরসা ভুল প্রমাণিত: আফগানিস্তানে বিমান হামলা ও সীমান্ত সংঘর্ষ

আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশের গুরবুজ জেলায় ডুরান্ড লাইনের কাছে পাকিস্তানি বিমান হামলার আশঙ্কায় বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র হাতে সতর্ক তালিবান সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানের তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ কাবুলে হাজির হয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু এই সপ্তাহে স্পষ্ট হয়েছে যে ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং দুই দেশের সেনার মধ্যে সীমান্তে সংঘর্ষ হয়েছে।

তালেবানের ওপর ভরসার বড় ভুল

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে বারবার অনুরোধ করার পরও তালেবান যদি আফগান ভূখণ্ডকে পাকিস্তানি জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না করে, তবে ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে যাবে। তাঁর মতে, সেই ধৈর্যই এবার ফুরিয়েছে। ২০২১-এর আগে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলত যে তারা তালেবানকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে, কিন্তু আজ পাকিস্তান অভিযোগ করছে যে তালেবান শাসিত আফগানিস্তান পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের জন্য নিরাপদ ঘাঁটি হয়ে উঠেছে।

ব্লোব্যাক ও সাপ পোষার উপমা

ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ পরিচালক কামরান বুখারি বলেন, ‘এটা বড়সড় “ব্লোব্যাক”। আপনি যদি এমন প্রক্সি শক্তিকে সমর্থন করেন, যারা আপনার জাতীয় পরিচয় বা জাতীয় বয়ানকেই চ্যালেঞ্জ করে, আপনাকে আদর্শগতভাবে বৈধ মনে করে না—তাহলে তারা যে একদিন আপনার দিকেই বন্দুক ঘুরিয়ে দেবে, সেটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।’ ২০১১ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়ে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আরও সোজাসুজি বলেছিলেন: ‘আপনি নিজের উঠোনে সাপ পুষে রেখে এই আশা করতে পারেন না যে, তারা শুধু আপনার প্রতিবেশীকেই দংশন করবে।’

টিটিপির উত্থান ও তালেবানের সমর্থন

তালেবান অবশ্য বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে যে তাদের ভূখণ্ড পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। শুক্রবারও তারা ইসলামাবাদকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর সঙ্গে আলোচনায় বসতে আহ্বান জানিয়েছে। ২০০৭ সালে আত্মপ্রকাশ করা টিটিপি এক দশক ধরে পাকিস্তান জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল, এবং তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানে তাদের হামলার সূচক আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় তালেবান ও টিটিপি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, এবং এখন তালেবান ক্ষমতায় থাকায় টিটিপির কাছে তা যেন ‘ঋণ শোধের’ সময়।

পাকিস্তানের কঠিন সিদ্ধান্ত ও ফলাফল

পাকিস্তান বলছে, আফগানিস্তানে দশক ধরে চলা অস্থিতিশীলতার সামনে তাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ৯/১১ হামলার পর ও যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান আগ্রাসনের পর ইসলামাবাদ কাবুলে ভারতের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তান একসময় এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ আফগানিস্তান চেয়েছিল, যেখানে ইসলামাবাদ আরামসে কাজ করতে পারবে এবং সেই লক্ষ্য পূরণের একমাত্র কার্যকর উপায় হিসেবে তাঁদের কাছে তালেবানকেই পছন্দসই মনে হয়েছিল। যদিও ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রই ছিল, কিন্তু পাকিস্তান তখন ভাবেনি যে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ার সিদ্ধান্তের ফলেই দেশের ভেতরে তীব্র উগ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, যার নেতৃত্বে উঠে আসে টিটিপি।

ভালো ও খারাপ জিহাদির বিভাজন ভেঙে পড়া

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তখন মনে করেছিল, আফগানিস্তানের তালেবানকে ‘ভালো’ জিহাদি বলা যায় কারণ তারা নাকি আলাদা প্রকৃতির, আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কাছে দেশের ভেতরের টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলো ‘খারাপ’ জিহাদি, যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। কিন্তু শুরু থেকেই এই বিভাজন খুব শক্ত ছিল না, এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের পার্থক্য প্রায় মুছে গেছে। টিটিপি গত কয়েক বছর ধরে নূর ওয়ালি মেহসুদের নেতৃত্বে অনেকটা সংগঠিত হয়েছে, তিনি দলটির ভাঙা অংশগুলোকে একত্র করেছেন এবং কৌশল বদলেছেন, এখন তারা সাধারণ মানুষকে নয়, সরাসরি সেনাবাহিনী ও পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। বিশেষ করে আফগানিস্তানে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর অনেক তালেবান সদস্য টিটিপিতে যোগ দিচ্ছেন, ফলে ‘ভালো’ আর ‘খারাপ’—এই তত্ত্ব এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে।

তালেবানের অবস্থান ও পাকিস্তানের ভোগান্তি

লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক আন্তোনিও জিউস্টোজির মতে, পাকিস্তান ভেবেছিল আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালিয়ে এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তালেবানকে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে, এমনকি প্রয়োজনে শীর্ষ আফগান নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বও নড়বড়ে করা যাবে। কিন্তু আফগানিস্তানে বোমাবর্ষণ উল্টো ফল দিয়েছে, কারণ হাইবাতুল্লাহ যদি পাল্টা জবাব না দিতেন, তবে তাঁর নিজের ভাবমূর্তি দুর্বল হয়ে যেত। কাবুল পাল্টা জবাব দেওয়ায় আফগানিস্তানে জাতীয়তাবাদী আবেগ আরও জোরদার হয়েছে, যা হাইবাতুল্লাহকেই বেশি শক্তিশালী করেছে। জিউস্টোজি আরও বলেন, তালেবান এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে, এমনকি পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তান প্রদেশকে আলাদা রাষ্ট্র করতে চাওয়া একটি ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহী আন্দোলনকেও তারা সমর্থন করছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

পাকিস্তানের প্রাক্তন বিশেষ দূত আসিফ দুররানি জানিয়েছেন, তালেবানের সামনে একসময় স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল—পাকিস্তান না টিটিপি, একটিকে বেছে নিতে হবে, আর তালেবান শেষ পর্যন্ত টিটিপিকেই বেছে নিয়েছে। দুররানির মন্তব্য, তালেবান এখনো সরকার হিসেবে ভাবতে শেখেনি, তারা এক ধরনের ‘যুদ্ধ অর্থনীতি’র মধ্যে রয়েছে, এবং তাদের আচরণ এখনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মতোই—রাষ্ট্র পরিচালনার মতো নয়। এই ধরনের প্রতিবেশী পাকিস্তানকে বড় ধরনের ভোগান্তিতে ফেলবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।