কঙ্গোর উভিরা শহরে গণকবরের ভয়াবহ আবিষ্কার
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলীয় উভিরা শহরের উপকণ্ঠে অন্তত ১৭১টি মৃতদেহ সংবলিত দুটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) উভিরা শহরের কিরোমনি ও কাভিমভিরা এলাকায় এই গণকবরগুলোর সন্ধান মেলে বলে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে। এম২৩ বিদ্রোহীরা ওই এলাকা থেকে পিছু হটার পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও একটি নাগরিক সমাজ সংগঠন এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মৃতদেহের সংখ্যা ও অবস্থান
দক্ষিণ কিভু প্রদেশের গভর্নর জ্যাঁ-জ্যাক পুরুসি জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত মরদেহের মধ্যে কিরোমনিতে ৩০টি এবং কাভিমভিরা এলাকায় ১৪১টি লাশ পাওয়া গেছে। এই গণকবরগুলো বিদ্রোহীদের দখলমুক্ত হওয়ার পর দৃশ্যমান হয়, যা স্থানীয় অধিকার রক্ষা সংগঠন ‘সিভিলিয়ান প্রোটেকশন নেটওয়ার্ক’ সরজমিনে পরিদর্শন করতে চাইলে কঙ্গোর সেনাবাহিনী তাদের বাধা প্রদান করে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংগঠনের এক নেতার দাবি অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিরা এম২৩ বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন।
বিদ্রোহীদের অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
বিদ্রোহীরা ধারণা করেছিল যে, এই ব্যক্তিরা সরকারি বাহিনী অথবা সরকারপন্থি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সদস্য ছিল। তবে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীন কোনো সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যদিও অতীতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা কঙ্গোর সেনাবাহিনী ও এম২৩ উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিল। এম২৩ বিদ্রোহীরা নিজেদের সংখ্যালঘু তুতসি সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের লড়াকু হিসেবে দাবি করলেও কঙ্গো সরকার তাদের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছে। কিনশাসা প্রশাসনের অভিযোগ, প্রতিবেশী দেশ রুয়ান্ডা এই বিদ্রোহীদের প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করছে।
পূর্ব কঙ্গোর দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত
পূর্ব কঙ্গোর খনিজসমৃদ্ধ এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত, বিশেষ করে রুয়ান্ডা সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানে অস্থিরতা লেগেই থাকে। ২০১২ সালে প্রথম বড় আকারের সংঘর্ষ শুরু হলেও ২০২১ সাল থেকে এম২৩ বা ‘মার্চ ২৩ মুভমেন্ট’ পুনরায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিদ্রোহীরা উত্তর কিভুর রাজধানী গোমা দখল করে এবং ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কিভুর রাজধানী বুকাভুর নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তীতে উভিরা শহরও তাদের দখলে চলে যায়। তবে সম্প্রতি তথাকথিত শান্তি প্রক্রিয়ায় সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বিদ্রোহীরা উভিরা থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলে এলাকাটি পুনরুদ্ধার করা হয় এবং এই গণকবরগুলো দৃশ্যমান হয়।
মানবিক সংকটের ভয়াবহতা
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী এই সশস্ত্র সংঘাতের ফলে পূর্ব কঙ্গোতে এ পর্যন্ত ৭০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। বর্তমানে কঙ্গোর এই পরিস্থিতিকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই গণকবরের আবিষ্কার সংঘাতের মাত্রা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে।
