মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় দফার আলোচনা শুরু
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের তীব্র আশঙ্কার মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে তৃতীয় দফায় বৈঠক করেছেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। ইরানের ওপর হামলা চালাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক হুমকির মধ্যে ওমানের মধ্যস্থতায় এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো।
কড়া নিরাপত্তায় জেনেভায় বৈঠক
বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি হয়েছে সুইজারল্যান্ডে ওমানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে। সেখানে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে একে একে উপস্থিত হন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা। দুই পক্ষের আলোচনা শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল বুসাইদি বলেন, 'নতুন ও সৃজনশীল বিভিন্ন পরিকল্পনার' প্রতি তেহরান ও ওয়াশিংটন নজিরবিহীন আগ্রহ দেখিয়েছে। তৃতীয় দফায় আলোচনা শুরু হওয়ার পর কিছুক্ষণ বিরতি দেওয়া হয়েছিল, গতকাল আবার বৈঠক হয়েছে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ও ইরানের অবস্থান
সূত্র জানিয়েছে, আলোচনায় জাতিসংঘের পরমাণু সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রসি অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া আলোচনার খবর সংগ্রহের জন্য ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলের একজন সাংবাদিকও সেখানে রয়েছেন। আলোচনার আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর দেশে কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকে যাচ্ছে না। তেহরানের পক্ষ থেকে এ–ও বলা হয়েছে যে আলোচনা হবে শুধু ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে। যদিও ওয়াশিংটন চায়, আলোচনার মধ্য দিয়ে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রতি সমর্থন কমিয়ে আনুক।
পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ ও আলোচনার পটভূমি
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে চায়। এর জেরে তেহরানের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে একটি চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে গত বছর ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হলে তা থেমে যায়। এরপর সম্প্রতি এ নিয়ে ওমান ও জেনেভায় প্রথম দুই দফার আলোচনায় বসে তেহরান-ওয়াশিংটন। বৃহস্পতিবারের আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি এ আলোচনাকে 'ঐতিহাসিক সুযোগ' বলে অভিহিত করেন। আরাগচি বলেন, এই চুক্তি দুই পক্ষের আয়ত্তের মধ্যেই রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় যোগ দেন ট্রাম্পের বিশেষ স্টিভ উইটকফ ও দূত জ্যারেড কুশনার। আগের দুই বৈঠকেও তাঁরাই উপস্থিত ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি
এদিকে আলোচনার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এএফপির একজন আলোকচিত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, ভূমধ্যসাগরের উদ্দেশে বৃহস্পতিবার গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ ত্যাগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আরও একটি রণতরিসহ নয়টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। রয়েছে মার্কিন যুদ্ধবিমানও। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনা ভেস্তে গেলে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা করছেন তেহরানের বাসিন্দারা। এমনই একজন ৬০ বছর বয়সী তাইয়েবেদ এএফপিকে বলেন, সংঘাত শুরু হলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে এবং মানুষের অনেক ভোগান্তি হবে। মানুষ এখই অনেক ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। তবে সংঘাত বাধলে ভাগ্য আরও বদলে যেতে পারে।
আলোচনার ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য প্রভাব
বর্তমান আলোচনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কমানোর জন্য এই আলোচনা একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। তবে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে, বিশেষ করে পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে। আলোচনার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার উপর। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য এই আলোচনার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
