ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের চার বছর: জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ের মুখে দেশ
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের চার বছর পূর্ণ হওয়ার পথে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাবে ইউক্রেন এখন এক ভয়াবহ ‘জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ের’ সম্মুখীন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দেশটি ক্রমশ ‘বিধবা ও এতিমদের দেশে’ পরিণত হচ্ছে, যেখানে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই খবর প্রকাশ করেছে, যা ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
যুদ্ধের প্রভাব: জনসংখ্যা হ্রাস ও মানবিক সংকট
শীর্ষস্থানীয় ইউক্রেনীয় ডেমোগ্রাফার এলা লিবানোভা সিএনএনকে বলেন, “এটি একটি মহা বিপর্যয়। মানুষ ছাড়া কোনও দেশ টিকে থাকতে পারে না।” তার মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেন প্রায় ১ কোটি মানুষ হারিয়েছে। এই সংখ্যায় যুদ্ধে নিহত ব্যক্তি, দেশত্যাগী শরণার্থী এবং রুশ অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধের কারণে অসংখ্য দম্পতি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন, যা জন্মহারকে আরও সংকুচিত করছে।
ওলেনা বিলোজারস্কার মতো অনেক নারী যুদ্ধে অংশ নিয়ে মা হওয়ার স্বাভাবিক সক্ষমতা হারিয়েছেন। ওলেনা জানান, ২০১৪ সালে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করে লড়াইয়ে যোগ দেন। ৪১ বছর বয়সে সেনাবাহিনী ছাড়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে জানান, তার মা হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৫ শতাংশ। এই গল্প ইউক্রেনের নারীদের উপর যুদ্ধের মারাত্মক প্রভাব তুলে ধরে।
প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব
কিয়েভের ‘নাদিয়া’ ক্লিনিকের পরিচালক ড. ভ্যালেরি জুকিন বলেন, যুদ্ধের মানসিক চাপ ও পরিবেশের কারণে প্রজনন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, “আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি গর্ভপাত এবং ভ্রূণের জিনগত অস্বাভাবিকতা দেখতে পাচ্ছি।” এমনকি ফ্রন্টলাইন থেকে ফেরা পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমানও আগের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ইউক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণহানির তথ্য প্রকাশ না করলেও মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর তথ্যমতে, গত চার বছরে ১ থেকে ১.৪০ লাখ ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন। যেহেতু ইউক্রেনে সেনাবাহিনীতে যোগদানের বয়স বেশি (গড় বয়স ৪৩ বছর), নিহতদের অধিকাংশই বিবাহিত এবং সন্তানের জনক, যা পরিবারগুলিতে দীর্ঘমেয়াদী শূন্যতা তৈরি করছে।
যুদ্ধবিধবা, এতিম শিশু ও মেধা পাচার
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ইউক্রেনে ৫৯ হাজার শিশু তাদের জৈবিক মা-বাবা ছাড়াই বেড়ে উঠছে, যাদের অধিকাংশই পালক পরিবারে রয়েছে। আইরিনা ইভানোভার মতো হাজারো নারী এখন যুদ্ধবিধবা। আইরিনা যখন নিশ্চিত হন তিনি অন্তঃসত্ত্বা, ততক্ষণে তার স্বামী ইউক্রেনের অভিজাত এফ-১৬ পাইলট পাভলো ইভানোভ ২০২৫ সালের এপ্রিলে লড়াইয়ে নিহত হন। ডিসেম্বরে তাদের কন্যা ইউস্তিনা’র জন্ম হয়, যে তার বাবার নীল চোখ পেয়েছে—এটি একটি করুণ স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।
২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে বিদেশে শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই তরুণী ও শিশু। লিবানোভা বলেন, “যতই সময় যাচ্ছে, শরণার্থীরা বিদেশে মানিয়ে নিচ্ছেন এবং তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।” এই গণপ্রস্থান ইউক্রেনের জন্য এক বিশাল ‘মেধা পাচার’ হিসেবে কাজ করছে, যা যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলবে।
আশার আলো: নতুন প্রজন্মের জন্ম
এই সংকটের মাঝেও কিছু গল্প আশার আলো দেখায়। ওলেনা বিলোজারস্কা ৪৬ বছর বয়সে ক্লিনিকে হিমায়িত ভ্রূণ থেকে তার সন্তান পাভলুস-এর জন্ম দিয়েছেন। তার ডাকনাম রাখা হয়েছে ‘বোহদান’, যার অর্থ ‘ঈশ্বরের উপহার’। ওলেনা মনে করেন, এই শিশুরাই ইউক্রেনের টিকে থাকার শেষ ভরসা, যা দেশের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে একটি সম্ভাবনার দিক নির্দেশ করে।
ইউক্রেনের এই জনসংখ্যাগত বিপর্যয় কেবল একটি জাতির জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক স্তরেও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের সমাপ্তি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এই সংকট মোকাবিলার চাবিকাঠি হতে পারে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।
