ইরান-মার্কিন পারমাণবিক আলোচনা: অনড় অবস্থান ও হরমুজ প্রণালিতে সামরিক মহড়া
দশকব্যাপী চলা পারমাণবিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত আলোচনার আগে সোমবার জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তবে দুই পক্ষের অনড় অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির ফলে সমঝোতার বিষয়ে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি সেই উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর জবাবে সোমবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সামরিক মহড়া শুরু করেছে ইরান। ‘স্মার্ট কন্ট্রোল অব দ্য স্ট্রেট অব হরমুজ’ শীর্ষক এই মহড়ার মাধ্যমে জলপথটি রক্ষায় রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌ ইউনিটের প্রস্তুতি যাচাই করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল প্রবাহের এক-পঞ্চমাংশ এই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়।
আলোচনার পরিধি নিয়ে মতভেদ
এ মাসের শুরুর দিকে দুই দেশ নতুন করে আলোচনা শুরু করলেও এর পরিধি নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন এখন পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার নিয়েও আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে কোনও আলোচনা হবে না। তারা কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছুটা সীমাবদ্ধতা আনতে রাজি, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করবে না।
ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
জেনেভায় অবস্থানরত ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ বলেন, "আমরা একটি ন্যায্য ও ন্যায়সংগত চুক্তিতে পৌঁছাতে চাই। তবে হুমকির মুখে নতি স্বীকার করা আমাদের এজেন্ডায় নেই।" অন্যদিকে, হাঙ্গেরি সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, "চুক্তি অর্জনের সুযোগ থাকলেও তা হবে অত্যন্ত কঠিন। কারণ আমরা এমন এক ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করছি যারা ভূ-রাজনীতির চেয়ে ধর্মতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তকে বেশি গুরুত্ব দেয়।"
আইএইএর চাহিদা ও ইসরায়েলের অবস্থান
আইএইএ গত কয়েক মাস ধরে ইরানের কাছে তাদের ৪৪০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইছে। বিশেষ করে গত জুনে নাতাঞ্জ, ফোরদো এবং ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পর সেখানে পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শনের অনুমতি চাইছে সংস্থাটি। এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন যে যেকোনও চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করার শর্ত থাকতে হবে। তার মতে, শুধু সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়।
ইরানের চূড়ান্ত বক্তব্য
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেছেন, "বল এখন আমেরিকার কোর্টে। তারা যে চুক্তি চায়, সেটি তাদেরই প্রমাণ করতে হবে।" ইরান বরাবরের মতোই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্য। এই অনড় অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা পারমাণবিক আলোচনার ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
