ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা: টিটিএপির অবস্থান কর্মসূচি চতুর্থ দিনেও অব্যাহত
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে তার দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত গুরুতর সমস্যা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বিরোধী জোট তেহরিক তাহাফ্ফুজ-ই-আইয়েন পাকিস্তান (টিটিএপি) এবং পিটিআইয়ের আইনপ্রণেতাদের অবস্থান কর্মসূচি টানা চতুর্থ দিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। এই আন্দোলনের মূল দাবি হলো কারাবন্দি ইমরান খানকে আল-শিফা আই ট্রাস্ট হাসপাতালে স্থানান্তর করা।
পার্লামেন্ট হাউসে চলমান অবস্থান ও নেতৃত্ব
বর্তমানে এই অবস্থান কর্মসূচি পার্লামেন্ট হাউসে সক্রিয়ভাবে চলছে, যেখানে জাতীয় পরিষদের বিরোধীদলীয় নেতা মেহমুদ খান আছাকজাই এবং সিনেটের বিরোধীদলীয় নেতা আল্লামা রাজা নাসির আব্বাস সরাসরি উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পার্লামেন্ট লজ ও কেপি হাউসে চলা অবস্থান কর্মসূচি ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আলী আমিন গান্ডাপুর কেপি হাউস ত্যাগ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিটিএপি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে আদিয়ালা জেলে আটক ইমরান খানকে আল-শিফা হাসপাতালে স্থানান্তর না করা পর্যন্ত তাদের এই আন্দোলন চলবে। এই দাবি ইমরান খানের স্বাস্থ্য সংকটকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে নতুন একটি রাজনৈতিক বিরোধের জন্ম দিয়েছে।
ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ
ইমরান খানের আইনজীবী এবং সুপ্রিম কোর্টের অ্যামিকাস কিউরি ব্যারিস্টার সালমান সাফদার কর্তৃক দাখিলকৃত প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে যে, তিনি সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেইন অক্লুশন (সিআরভিও) নামক একটি গুরুতর চোখের রোগে আক্রান্ত। এই রোগ সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের মতো স্বাস্থ্য ঝুঁকির সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে কারাবন্দি ইমরান খান তার ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারানোর অভিযোগ করেছেন। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পিটিআই এবং তার পরিবারের সদস্যরা তার স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাকে অবিলম্বে হাসপাতালে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন।
চিকিৎসা পরীক্ষা ও উন্নতির প্রতিবেদন
সূত্রমতে, পাঁচজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ইমরান খানের বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করেছেন। এই পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে যে তার ডান চোখের ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। চলমান চিকিৎসা প্রক্রিয়ার ফলে আরও উন্নতি আশা করা হচ্ছে বলে মেডিক্যাল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রিপোর্টটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল রিপোর্ট জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। সেই নির্দেশনা মেনেই এই সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। এদিকে, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (পিমস) এবং আল-শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল ইমরান খানের চোখের অবস্থার উন্নতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
চক্ষু বিশেষজ্ঞরা তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সাথে দেড় ঘণ্টা ব্যাপী একটি বিস্তারিত ব্রিফিং সেশনও পরিচালনা করেছেন। কারা কর্তৃপক্ষ ইমরান খানের রক্তচাপ, নাড়ির গতি, দেহের তাপমাত্রা এবং রক্তে শর্করার মাত্রাসহ সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য নথি পাঞ্জাব হোম ডিপার্টমেন্টে প্রেরণ করেছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও পরবর্তী কর্মসূচি
টিটিএপি প্রধান মেহমুদ খান আছাকজাই পার্লামেন্ট হাউসে দুপুর ১টায় সংসদ সদস্যদের একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন, যেখানে পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হবে। অন্যদিকে, ইমরান খান তোষাখানা-২ মামলায় প্রদত্ত ১৭ বছরের কারাদণ্ড স্থগিত এবং চিকিৎসা ও মানবিক কারণে জামিনের আবেদন নিয়ে ইসলামাবাদ হাইকোর্টে আবেদন করেছেন।
এই মামলায় ইমরান খান এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবি উভয়েই দণ্ডিত হয়েছেন। এছাড়াও, আল-কাদির ট্রাস্ট মামলা, যা ১৯০ মিলিয়ন পাউন্ডের কেলেঙ্কারি হিসেবেও পরিচিত, সেই মামলায় সাজা স্থগিতের আবেদনের দ্রুত শুনানির জন্যও পৃথক আবেদন দাখিল করা হয়েছে। এই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ইমরান খানের বর্তমান রাজনৈতিক ও স্বাস্থ্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং বিরোধী জোটের অবস্থান কর্মসূচি পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে, যার সমাধান এখনও অনিশ্চিত।



