পাকিস্তানে ইমরান খানের চিকিৎসার দাবিতে বিরোধী নেতাদের দ্বিতীয় দিনের অবস্থান কর্মসূচি
পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের চিকিৎসার দাবিতে বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যরা শনিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। ইসলামাবাদের পার্লামেন্ট হাউস ও কেপি হাউসে (খাইবার পাখতুনখাওয়া হাউস) এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয় পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এবং তেহরিক-ই-তাহাফুজ-ই-আইন-ই-পাকিস্তান (টিটিএপি)–এর ব্যানারে।
বিরোধীদের মূল দাবি ও প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দলগুলোর দাবি, পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টকে জানানো হয়, ইমরানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তির মাত্র ১৫ শতাংশ কার্যক্ষম আছে। এ খবর দলটির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং এরপরই এ অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।
গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর এ অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয় এবং সারা রাত ধরে চলে। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা জোর দিয়ে বলেন, পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।
নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণকারী
এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন টিটিএপির চেয়ারম্যান মেহমুদ খান আচাকজাই। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহর আলী খান, সিনেটর আলী জাফর, আসাদ কায়সার, জুনায়েদ আকবরসহ অন্য বিশিষ্ট নেতারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পিটিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সালমান আকরাম রাজা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পার্লামেন্ট হাউস, পার্লামেন্টের লজগুলো এবং কেপি হাউসকে ‘কারাগারে পরিণত করা হয়েছে’।
পিটিআইয়ের কেন্দ্রীয় তথ্যসচিব শেখ ওয়াকাস আকরাম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তাঁদের অবস্থান কর্মসূচি দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে এবং বিরোধী নেতারা পার্লামেন্ট হাউসের ভেতরে ‘অবরুদ্ধ’ হয়ে আছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশ রাতে আমাদের খাবার এবং আজ সকালে ভেতরে নাশতা নিতে দেয়নি।’
অন্যান্য দলের অংশগ্রহণ
আওয়াম পাকিস্তান নামের একটি দল তাদের সব নেতাকে অবিলম্বে এ অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে যোগ দিতে দলের শীর্ষ নেতারা ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। অবস্থান কর্মসূচিতে আওয়াম পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করবেন দলের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র জাফর মির্জা।
জাফর মির্জা বলেন, ‘সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সুরক্ষা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।’ তিনি আরও বলেন, ইসলামাবাদ পুলিশ ও প্রশাসন রেড জোন এলাকাটিকে ‘কারাগারে’ পরিণত করেছে এবং সরকার কেপি হাউসে যাওয়ার সব রাস্তায় ব্যারিকেড বসিয়ে দিয়েছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার (কেপি) মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি দেশের অন্যান্য স্থানে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্সে সোহাইল লেখেন, ‘ইমরান খান সাহেবের স্বাস্থ্য আমার কাছে রাজনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে আমি নিজেও রাজনীতি করব না, অন্য কাউকে তা করতেও দেব না।’
ইমরান খানের পরিবারের প্রতিক্রিয়া
এর আগে শনিবার সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা করেন ইমরান খানের বোন আলিমা খানম। তাঁর অভিযোগ, সরকার আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করার পরও সুপ্রিম কোর্ট কোনো ব্যবস্থা নেননি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আলিমা উল্লেখ করেন, আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টের ‘লিখিত আদেশের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সারা দিন এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সারা দিন’ অপেক্ষা করেছিলেন।
ইমরানের বোন জোর দিয়ে বলেন, আদেশটি হওয়া উচিত ছিল ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে অবিলম্বে পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য জরুরি আদেশের প্রয়োজন ছিল।
চিকিৎসকের পরামর্শ
গত শুক্রবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ফয়সাল সুলতান পরামর্শ দেন, পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতাকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা উচিত, যাতে তাঁকে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। ফয়সাল সুলতান শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালের (এসকেএমসিএইচ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। তিনি গণমাধ্যমের সেসব প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে ইমরান তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি ৮৫ শতাংশ হারিয়ে ফেলেছেন।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
এর আগের দিন পার্লামেন্টের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি শুরুর আগে পার্লামেন্ট–বিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁকে অবরোধের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিরোধীদের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। তবে তিনি দাবি করেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অবরোধ দেওয়া হয়নি।’
তারিক ফজল চৌধুরী বলেন, সরকার বিরোধীদের ‘বারবার’ আশ্বস্ত করেছে, ‘ইমরানের স্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো অবহেলা সহ্য করা হবে না’। তিনি আরও বলেন, ‘এটিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার কোনো প্রয়োজন নেই; এটি একটি চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়।’ কারাবন্দী নেতার দৃষ্টিশক্তি নিয়ে নানা দাবির মধ্যেই তারিক ফজল চৌধুরী আশ্বস্ত করেন, ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য ‘যেখানে তিনি চাইবেন’ সেখানেই নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো অবহেলা করা হবে না।’
