ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত অনৈক্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকের মতামত
আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক আন্দ্রেয়া ড্রেসি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে বা এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা নিয়ে প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট ঐক্য নেই।
ড্রেসির মতে, আমরা প্রতিনিয়ত যুদ্ধের লক্ষ্য পরিবর্তন এবং রণকৌশলের অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করছি, যা প্রমাণ করে যে মার্কিন প্রশাসন এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা
আন্দ্রেয়া ড্রেসি বিশ্লেষণ করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনের ভেতরে বর্তমানে মতপার্থক্য ও বিবাদ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে পেন্টাগন এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে।
ড্রেসি মনে করেন, এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এটাই প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কোনো সুদূরপ্রসারী কৌশলগত চিন্তা ছাড়াই এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রভাবগুলো সম্পর্কে তাদের মধ্যে সঠিক হিসাব-নিকাশের অভাব ছিল বলেই বর্তমানে তারা একটি অচলাবস্থার মধ্যে আটকে পড়েছেন।
যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার একটি পথ বা ‘অফ র্যাম্প’ খুঁজছে বলে ড্রেসি তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে কূটনীতির সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছে যা একটি ইতিবাচক দিক হলেও ঝুঁকির মাত্রা এখনো অত্যন্ত বেশি।
এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় একটি পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা জনমানসে বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্যে এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সামগ্রিক প্রভাব
সামগ্রিকভাবে আন্দ্রেয়া ড্রেসির এই বিশ্লেষণ এটাই ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়হীনতা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয় বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। যুদ্ধের শুরুতে যে দ্রুত জয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা এখন একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পরিণত হয়েছে।
সামরিক শক্তির মাধ্যমে সমাধান খোঁজার পরিবর্তে প্রশাসন এখন রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে, যদিও তা কতটা সফল হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। যুদ্ধের এই অনিশ্চিত গতিপ্রকৃতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা



