ট্রাম্প-ইরান অচলাবস্থা: কে বেশি সময় টিকবে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিইরানের নেতারা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তুলনায় তাঁরা বেশি সময় ধরে এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবেন। তবে তেহরানের এই কৌশল সাধারণ ইরানিদের জন্য চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
যুদ্ধবিরতি ও পাল্টা হুমকি
যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবিত আলোচনার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানের নেতারা একে অপরকে পাল্টা হুমকি ও অপমান করেছেন। বিষয়টি ছিল অনেকটা ‘কে আগে হার মানে’ এর মতো। তবে শেষ পর্যন্ত অন্তত ইরানের দৃষ্টিতে ট্রাম্পই আগে পিছু হটেছেন। দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার জন্য ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো পক্ষই তখনো পাকিস্তানে পৌঁছায়নি। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। ট্রাম্প তখন বলেন, ইরানের নেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তের জবাব দেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে। কোনো একটি সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি চলবে।
ইরানের আত্মবিশ্বাস ও সময়ের হিসাব
ইরানের নেতৃত্বের চোখে যুদ্ধের ধকল সহ্য করার ক্ষমতা ট্রাম্পের চেয়ে তাঁদেরই বেশি। চলমান যুদ্ধবিরতির ফলে তাঁদের সেই বিশ্বাস আরও জোরালো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারপরও ইরানের নেতারা মনে করছেন, তাঁরা দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর অবরোধের চাপ সইতে সক্ষম। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাটা ট্রাম্প বেশি দিন সহ্য করতে পারবেন না।
চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, “ইরানিরা মাস ধরে নিজেদের সময় হিসাব করে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ও বিশ্ব অর্থনীতির সময়কে দেখে সাপ্তাহিক হিসাবে।” এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ইরানের নেতারা মনে করছেন, ট্রাম্প আরও তিন সপ্তাহও এই প্রণালির বন্ধ থাকা সহ্য করতে পারবেন না।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ নৌ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়। এর প্রভাব সারা বিশ্বে পড়েছে। শুধু তেলের দাম বেড়েছে, তা নয়। সার ও গ্যাসেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন।
আলোচনা ভেস্তে যাওয়া ও অভিযোগ
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথম দফার আলোচনা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। এরপরই ট্রাম্প পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানে নৌ অবরোধ শুরু করেন। এর লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া। কারণ, এই তেলের ওপরই ইরানের অর্থনীতি টিকে আছে। শান্তি আলোচনা কেন ভেস্তে গেল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এর জন্য ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বের ‘মারাত্মক বিভক্তি’–কে দায়ী করেন। তাঁর দাবি, আলোচনার আগে ইরানি নেতারা নিজেদের অবস্থানে একমত হতে পারেননি।
অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ ভিন্ন। তাঁরা বলেন, ট্রাম্প আলোচনার আগেই অবরোধ তুলে নিতে রাজি হননি। এর মধ্যে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পতাকাবাহী একটি জাহাজও জব্দ করেছে। মঙ্গলবার রাতে ইসলামাবাদে কেউ যাচ্ছেন না নিশ্চিত হওয়ার পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন, “ইরানের বন্দর অবরোধ করা যুদ্ধের শামিল। এটি যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।”
ইরানের কৌশল ও ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা
যুদ্ধের পুরোটা সময়জুড়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকিকে গুরুত্ব না দেওয়ার কৌশল অনুসরণ করছে ইরান। এই কাজে তারা বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক মিম ও ভিডিও ব্যবহার করছে। গত বুধবার ভোরে ইরানের বেশ কিছু আধা সরকারি সংবাদমাধ্যম একটি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও প্রকাশ করে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, রাগান্বিত ট্রাম্প ইরানকে বোমা মারার হুমকি দিচ্ছেন। অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকারীরা বসে আছেন। কিন্তু সেখানে ইরানের কোনো প্রতিনিধি নেই। পরিবর্তে একটি চিরকুট পাঠিয়ে বলা হয়েছে, “ট্রাম্প, আপনি চুপ করুন।”
দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
ইতালির মিলান শহরের ইউনিভার্সিটি অব ক্যাথলিকের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আবদোররসুল দিভসাল্লার বলেন, আলোচনা আবার শুরু হওয়ার পথে মূল বাধা হলো উভয় দেশের দৃষ্টিভঙ্গি। দুই দেশই মনে করছে, তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে এবং নিজের শর্ত অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে। দিভসাল্লার আরও বলেন, ইরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যগুলো সফল হতে না দেওয়াই তাদের জন্য বড় জয়। তারা ভাবছে, ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে আর কোনো ভালো বিকল্প নেই। তাই এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ইরানেরই লাভ হবে।
অবশ্য এ বিষয়ে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন। তাঁরা বলছেন, তেহরানের নেতৃত্ব এই অচলাবস্থায় টিকে গেলেও দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে। যুদ্ধের আগে থেকেই ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে ছিল। সেই সংকটের কারণে গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। পরে কঠোরভাবে সেই বিক্ষোভ দমন করা হয়। ইরানের নেতারা অর্থনৈতিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত হলেও সাধারণ মানুষকে এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানিরা নিয়মিত চাকরি হারানো ও অভাব-অনটনের কথা লিখছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ বলেন, “জনগণের কষ্ট নিয়ে নয়, বরং ইরান সরকার কেবল নিজেদের টিকে থাকা নিয়েই ভাবছে। তারা একে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে।” ভায়েজ আরও বলেন, এ কারণেই সাধারণ মানুষের যতই কষ্ট হোক, ইরান সহজে পিছু হঠবে না।



