ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরান শান্তি আলোচনা অনিশ্চিত, মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরান শান্তি আলোচনা অনিশ্চিত

ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরান শান্তি আলোচনা অনিশ্চিত, মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগ

গত সপ্তাহের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি হতে পারে বলে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টের কারণে সেই আলোচনা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের কর্মীরা আগে নিশ্চিত করেছিলেন যে তিনি এমন কিছু বলবেন না, কিন্তু তিনি সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে দর-কষাকষির চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে।

আলোচনার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা

ট্রাম্প গত শুক্রবার সকালে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা তাঁকে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে চলমান আলোচনার হালনাগাদ তথ্য দেওয়ার সময় ফোনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে যেসব দাবি করেন, ইরানি কর্মকর্তারা পরে সেগুলোর অনেকগুলোই প্রত্যাখ্যান করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরান নতুন করে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু তেহরান এই দাবি অস্বীকার করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সিএনএনের কাছে স্বীকার করেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য মন্তব্য আলোচনার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। তাঁরা উল্লেখ করেন, এই আলোচনা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের গভীর অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ট্রাম্পের দাবি ও ইরানের প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্প বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেশ কিছু দাবি করেছেন। তিনি ব্লুমবার্গকে বলেছেন যে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ‘অনির্দিষ্ট’ সময়ের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়েছে। সিবিএস নিউজকে তিনি বলেছেন, তেহরান ‘সবকিছুর সঙ্গে একমত হয়েছে’ এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে। অ্যাক্সিওসকে তিনি বলেছেন, আরেকটি বৈঠক ‘সম্ভবত সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত হবে’ এবং তিনি মনে করেন আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে।

কিন্তু ইরানিরা ট্রাম্পের এসব দাবি ভালোভাবে নেননি। আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি সিএনএনকে বলেন, ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আলোচনার চেষ্টা এবং এমনভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা, যেন ইরানিরা এমন বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন যা নিয়ে তারা এখনো একমত হননি, এতে ইরানিরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ওই ব্যক্তি আরও বলেন, ইরানিরা উদ্বিগ্ন যে এভাবে তাদের দুর্বল মনে হতে পারে।

যুদ্ধবিরতি ও উত্তেজনা বৃদ্ধি

ট্রাম্পের এসব দাবির মধ্যে গত রোববার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নতুন করে বড় পরীক্ষার মুখে পড়ে। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ওমান উপসাগরে মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজে গুলি চালায় এবং সেটি জব্দ করে। এই ঘটনা ইরানিদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে।

দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ট্রাম্পকে এখন আবার একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তিনি কি একটি চুক্তি করবেন, নাকি এমন একটি সংঘাত আরও তীব্রতর করবেন, যেটি এখনকার মতো শেষ হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

আলোচনার শর্ত ও ট্রাম্পের অবস্থান

ট্রাম্প আলোচনার জন্য ইরানকে বেশ কিছু ‘সীমারেখা’ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে—ইরানকে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত করতে হবে এবং প্রায় পারমাণবিক বোমা তৈরির মানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে হবে। অন্যদিকে, তেহরান জোর দিয়ে বলছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে তুলে দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।

আলোচনার প্রথম দফায়, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জবাবে ইরান পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছে। সাম্প্রতিক একটি প্রস্তাবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—প্রথমে ১০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখা হবে, এরপর আরও এক দশক ইরান শুধু অস্ত্র-মানের অনেক নিচের স্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বাতিল চান। তিনি এমনকি প্রথম দফা আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানকে ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তিনি তার বিরোধিতাও করেন।

চুক্তির সম্ভাবনা ও ট্রাম্পের অনড় অবস্থান

ট্রাম্প তাঁর একটি অবস্থানে একদম অনড় রয়েছেন। সেটা হলো, এমন কোনো চুক্তিতে সম্মত না হওয়া, যা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে হওয়া ইরান পারমাণবিক চুক্তির মতো হবে। ট্রাম্প শুরু থেকেই ওই চুক্তিকে দুর্বল বলেছেন এবং ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন।

একটি চুক্তি না হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তত একটি প্রাথমিক রূপরেখাভিত্তিক সমঝোতা তৈরি হবে, এমনটা আশা করেছিলেন আলোচকেরা। তাঁরা ভেবেছিলেন, যদি একটি সমঝোতা তৈরি হয়, তবে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে চুক্তির সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীর আলোচনার পথ খুলে যাবে।

কিন্তু সোমবার ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দারুণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে বসেন, তিনি কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য চাপ অনুভব করছেন না। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে এই যুদ্ধ ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যার পেছনে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া বড় ভূমিকা রাখছে।

ট্রাম্পের মিথ্যা ও বিভ্রান্তি

ঘন ঘন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভ্যাসের কারণে আলোচনার ক্ষতিকর হতে পারে—এটা নিয়ে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ট্রাম্পের কোনো উপদেষ্টা তাঁকে সতর্ক করেছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। সেদিন দুপুর থেকে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ইরান যুদ্ধ নিয়ে একাধিক পোস্ট দেন, যেখানে তিনি ৯০০-এর বেশি শব্দ লিখেছেন।

ট্রাম্পের এসব প্রকাশ্য মন্তব্য আলোচনা ঘিরে শুধু অনিশ্চয়তাকেই আরও বাড়িয়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, রোববার সকালে ট্রাম্প বলেছিলেন, নিরাপত্তাসংক্রান্ত কারণে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দ্বিতীয় দফা আলোচনায় অংশ নেবেন না। যদিও ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ, তা তিনি সুনির্দিষ্ট করে বলেননি। একই সময়ে তাঁর সরকারের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা—জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস এবং জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, ইসলামাবাদে প্রথম দফা আলোচনার মতো এই দফার আলোচনায়ও নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স।

এক দিন পর ট্রাম্প আরেকটি বিভ্রান্তিকর হালনাগাদ তথ্য দেন, এবার তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্টের অবস্থান নিয়ে। ট্রাম্প নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাংবাদিককে বলেন, ভ্যান্স আকাশে রয়েছেন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আলোচনার জন্য পাকিস্তানে অবতরণ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায়, ভ্যান্সের গাড়িবহর তাঁকে নিয়ে হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা ব্যাখ্যা দেন, ‘আমরা আশা করছি, প্রতিনিধিদল শিগগিরই রওনা দেবে।’

বহু বছর ধরে বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের মিথ্যা বলার ইতিহাস রয়েছে। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন, নাকি তিনি বারবার ভুল তথ্যের শিকার হচ্ছেন, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু তাঁর মিথ্যার পুনরাবৃত্তি এতটাই বেশি যে নেপথ্যে ইরান আসলে কী বলছে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

শেষ পর্যন্ত, ট্রাম্পের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে, এবং মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে এই পরিস্থিতি যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে।