যুদ্ধবিগ্রহকে বলা হয় ‘শান্তির শত্রু’ এবং পরিবেশ ও ‘মানবতার খুনি’। বিশ্বসভ্যতা আজ এই কথার তাৎপর্য উপলব্ধি করিতেছে মর্মে মর্মে। মানুষ আজ সত্যিই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সম্মুখীন। প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভূতপূর্ব অগ্রযাত্রার যুগে দাঁড়াইয়াও মানবজাতি যুদ্ধের অভিশাপ হইতে মুক্ত হইতে পারিতেছে না। সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে আমরা ঠিক ইহাই প্রত্যক্ষ করিতেছি।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব
পরাশক্তিগুলির রণধ্বনি-রণহুংকারে বিশেষত দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ আজ মুমূর্ষু হইয়া পড়িয়াছে। রণক্ষেত্র হয়তো সহস্র মাইল দূরে; কিন্তু তাহার অভিঘাত বিশ্বায়নের এই যুগে সীমান্ত মানিয়া চলিতেছে না। ফলে যুদ্ধ না করিয়াও তাহারা যুদ্ধের শিকার; দোষ না করিয়াও দোষী! সাধারণত যুদ্ধের প্রথম আঘাত আসে অর্থনীতির উপর। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। সেইখানে অস্থিরতা বৃদ্ধি পাইলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয় স্বাভাবিকভাবেই। ইহার ফলে আমদানিনির্ভর দেশসমূহের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পরিবহন খরচ বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে করিয়া তোলে দুর্বিষহ।
যুদ্ধের সিদ্ধান্ত যাহারা গ্রহণ করেন, তাহারা হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের বাহিরে নিরাপদে অবস্থান করিতে পারেন; কিন্তু বিশ্বের কোটি কোটি নিরীহ মানুষ যাইবে কোথায়? সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হইয়া পড়িলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলিবে কী করিয়া? প্রবাসী শ্রমবাজারের অবস্থাই-বা কী হইবে? মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লক্ষ লক্ষ প্রবাসী শ্রমজীবী কর্মরত রহিয়াছেন। চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কর্মসংস্থান সংকুচিত হইয়াছে এবং বৃদ্ধি পাইয়াছে নিরাপত্তা ঝুঁকি, যাহার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়িতেছে সেই সকল দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের উপর। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অসংখ্য পরিবারের জীবিকা এই রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হইবে, এই খাত তত চাপের মুখে পড়িবে— বিশ্বনেতারা কি সত্যিই ইহা উপলব্ধি করিতে পারেন না?
মানবিক বিপর্যয় ও মানসিক প্রভাব
শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নহে, যুদ্ধ মানবিক বিপর্যয়েরও জন্ম দেয়। লেবানন, সিরিয়া কিংবা অন্যান্য সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল হইতে যখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুসংবাদ বা লাশ আসে, তখন তাহা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সমগ্র জাতির বেদনাকেই নাড়াইয়া দিয়া যায়। যুদ্ধের কারণ কিংবা পক্ষ না হইয়াও ভুক্তভোগী পরিবারগুলিকে এইরূপ শোক কেন বহন করিতে হইবে? বৈশ্বিক সংঘাত-সংঘর্ষে সাধারণ মানুষের জীবনের এই নীরব বলিদান কি বন্ধ হইবে না?
যুদ্ধের আরেকটি অদৃশ্য কিন্তু গভীর ক্ষতি হইল মানসিক অবসাদ ও অনিশ্চয়তা। প্রবাসে কর্মরত স্বজনদের নিরাপত্তা লইয়া উদ্বেগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করে। একটি দেশের নাগরিক যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না থাকিলেও যুদ্ধের মানসিক অভিঘাত তাহাদের জীবনকে প্রভাবিত করে—ইহা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য। অর্থাৎ, বৈশ্বিক সংঘাত কেবল ভূরাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকট নহে, ইহা মানবিক ও সামাজিক সংকটেরও জনক।
উপসংহার: যুদ্ধের বিকল্প প্রয়োজন
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান আনিতে পারে নাই। বরং যুদ্ধ শেষ হইলেও তাহার ক্ষত বহু বৎসর ধরিয়া বহন করিতে হয়। বিশেষ করিয়া, যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতির বাহিরে উন্নয়নশীল দেশসমূহের অর্থনীতি, শ্রমবাজার, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকারে পরিণত হয়। কানেকটিভিটির এই যুগে কোনো একটি অঞ্চলের যুদ্ধ কেবল সেই অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মুহূর্তের মধ্যে তাহা পরিণত হয় সমগ্র বিশ্বের সমস্যায়। অথচ পরিতাপের বিষয় হইল, আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় এই বাস্তবতা যেন কখনই গুরুত্ব পায় না। যুদ্ধের আগুন যখন এক দেশে জ্বলে, তখন তাহার দহন পৌছায় বহু দূর অবধি। বাংলাদেশসহ অসংখ্য নিরীহ উন্নয়নশীল দেশ আজ সেই দহনের তাপ অনুভব করিতেছে। বিশ্বনেতারা যত দ্রুত এই বাস্তবতা উপলব্ধি করিবেন, মানবতার জন্য ততই মঙ্গল।



