সাইরেন বাজিয়ে এক এক করে চারটি লাশবাহী গাড়ি এসে থাকমো বাড়ির উঠানে। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর আহাজারিতে পুরো এলাকা স্তব্ধ। একসঙ্গে পরিবারের চার জনের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না কেউ। তাদের একনজর দেখতে নিহতদের বাড়িতে ভিড় করেছেন সবাই। ফরিদপুরে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মাদারীপুরের এক পরিবারের চার জনসহ পাঁচ জন নিহতের বাড়ির দৃশ্য ছিল এমন। রবিবার (২৪ মে) বিকাল ৪টার দিকে নিহতদের লাশ গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছায়। তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। অসুস্থ ভাইকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার জন্য পরিবারের সদস্যরা সঙ্গে গেলেও সবাইকে ফিরতে হয়েছে লাশ হয়ে। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনায় সবাই শোকে ভেঙে পড়েছেন।
শোকের ছায়া ও জানাজা
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকালে দাফন করার জন্য বাড়ির সামনে মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে চারটি কবর সারিবদ্ধভাবে করা হয়েছে। বাদ মাগরিক জানাজা শেষে দাফন করা হয় তাদের। নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের হাজী মোহাম্মদ অহেদ মোল্লার বড় ছেলে বিএডিসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা (৬৫), তার স্ত্রী বেলী বেগম (৪০), মেজো ছেলে ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন মোল্যা (৪০) ও তার স্ত্রী খুরশিদা বেগম খুশি (৩৬)। অপর নিহত ব্যক্তি হলেন অ্যাম্বুলেন্স চালক কাউসার মাতুব্বর (২৫)।
দুর্ঘটনার বিবরণ
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মেজো ভাই আলমগীর হোসেন মোল্লা প্রায় দুই মাস আগে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে যান। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হয়ে ফরিদপুর থেকে মাদারীপুরে আসেন। রবিবার সকালে আবার আলমগীর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য প্রথমে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা করেন পরিবারের চার সদস্য। সঙ্গে ছিলেন অ্যাম্বুলেন্সচালক। ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশা এলাকায় পৌঁছালে ঢাকাগামী বিআরটিসি পরিবহন বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আলমগীর হোসেন মোল্লা ও তার স্ত্রী খুরশিদা বেগম খুশি, বড় ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ও তার স্ত্রী বেলী বেগম। এ ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সচালক মাদারীপুর শহরের হাসপাতাল রোড এলাকার বাসিন্দা কাওসার মাতুব্বরও মারা যান।
নিহতদের পরিবার ও শোক
নিহত জাহাঙ্গীর হোসেন বিএডিসির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তার এক ছেলে সিফাত হোসেন মোল্যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। মেয়ে সুইটি আক্তার মাদারীপুর সরকারি কলেজে অনার্সে পড়েন। অপর নিহত আলমগীর হোসেন সারের ব্যবসা করতেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সুরভী আক্তারকে পড়াশোনা শেষ করে বিয়ে দিয়েছেন। আরেক মেয়ে স্বর্ণালী আক্তার দশম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ছেলে সিয়াম মোল্যা স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। নিহতদের চাচা আব্দুল হামিদ মাস্টার বলেন, ‘এই মৃত্যু আমরা কীভাবে মেনে নেবো। এক পরিবারের চার জন মারা যাওয়ায় পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমার বড় ভাই নিহতের বাবা মোহাম্মদ অহেদ মোল্লার অসুস্থ। অসুস্থার জন্য তার এক পা কেটে ফেলা হয়েছে। হুইলচেয়ারে চলাফেলা করেন। বয়স প্রায় ১০০ বছর। একা একা কিছুই করতে পারেন না। সবাই তার দেখাশোনা করলেও তার মেজো ছেলে নিহত আলমগীর হোসেন মোল্লার স্ত্রী খুরশিদা তার শশুরের যত্ন বেশি নিতেন। কিন্তু এখন এই বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনা কে করবে। তার তিন ছেলের মধ্যেই দুই ছেলে ও ছেলের বউ মারা গেছেন। এতে করে পুরো পরিবারটাই যেন শেষ হয়ে গেলো। এমন মৃত্যুর ঘটনা যেন কোনও পরিবারে না আসে।’
প্রতিবেশী কামাল হোসেন বলেন, ‘নিহত আলমগীর হোসেন ও তার স্ত্রী খুরশিদা বেগম খুশি অনেক শখ করে পছন্দমতো ডিজাইনে একটি একতলা বিল্ডিং করেছেন। ইতিমধ্যে ঘরের সমস্ত কাজ শেষ হয়েছে। ধবধবে সাদা রং করেছে বিল্ডিংয়ে। ঈদের আগেই নতুন ঘরে উঠার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হলো না। নতুন ঘরে যাওয়ার আগেই চিরতরে দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। তার দুই মেয়ে এক ছেলে।’
নিহতদের আত্মীয় ফায়েক মুন্সি বলেন, ‘এমন দুর্ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। বিআরটিসি বাসের চালকের বিচার হওয়া উচিত। আর ফরিদপুর-বরিশাল সড়কটি চার লেন বা ছয় লেনে উন্নীতকরণ করা হলে এই সড়কে দুর্ঘটনা কম যাবে। এই সড়কটি সরু হওয়ায় দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, ‘একসঙ্গে এক পরিবারসহ পাঁচ জনের মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। উপজেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবে এবং প্রয়োজন হলে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করবে।’



