যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনায় দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা বিপদে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনায় তিমি বিপদে

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান ঘিরে চলা উত্তেজনা শুধু তেলের দাম বাড়াচ্ছে না, বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করছে না—এর প্রভাব পড়ছে সমুদ্রের গভীরে, দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিদের জীবনেও। মঙ্গলবার আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

হুথি হামলার পর জাহাজের রুট পরিবর্তন

২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে জাহাজ হামলার পর থেকেই বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নতুন রাস্তা খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। এখন ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বেশিরভাগ জাহাজ এড়িয়ে চলছে মধ্যপ্রাচ্যের সংক্ষিপ্ত রুট। ফলে তাদের যেতে হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার 'কেপ অব গুড হোপ' ঘুরে।

এই ঘুরপথের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে জাহাজ চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পোর্টওয়াচ মনিটরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৮৯টি বাণিজ্যিক জাহাজ দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে গেছে। গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৪টি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিমিদের প্রধান আবাসস্থল বিপদে

দক্ষিণ আফ্রিকার জলসীমায় রয়েছে ৪০টিরও বেশি প্রজাতির তিমি। কেপ অব গুড হোপ এলাকা বিশেষ করে সাউদার্ন রাইট হোয়েল, হাম্পব্যাক হোয়েল ও ব্রাইডস হোয়েলের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল। এখানে দেখা মেলে ওরকা, স্পার্ম হোয়েল, মিঙ্ক হোয়েলসহ নানা ধরনের ডলফিনেরও। বিশেষ করে হাম্পব্যাক তিমিদের বিশাল একটি দল এই এলাকায় খাবার খেয়ে অ্যান্টার্কটিকার দিকে যাত্রা শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম্পব্যাক তিমির দল—সংখ্যায় প্রায় ১১ থেকে ১৩ হাজার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এলস ভারমিউলেন বলেন, 'অনেক সময় কার্গো জাহাজের লোকেরা ভিডিও করে পোস্ট দেয়—'ওয়াও, কত তিমি দেখছি!' কিন্তু সেটা দেখে আমার বুক কেঁপে ওঠে। কারণ আমি জানি, ওই জাহাজগুলো হয়তো কয়েকটা তিমির গায়ে ধাক্কা মেরে চলে যাচ্ছে।' তিনি আরও জানান, দ্রুতগতির জাহাজের সংখ্যা এই এলাকায় এখন চার গুণ বেড়েছে। তিমিরা বিশেষ করে খাবার খাওয়ার সময় বিপদ বুঝতে পারে না।

জলবায়ু পরিবর্তন ও তিমির আচরণ

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের বিশেষজ্ঞ ক্রিস জনসন বলেন, তিমিরা এখনও জাহাজের গতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখেনি। কোনো কোনো প্রজাতি শব্দ শুনলে পালানোর বদলে পানির আরও গভীরে চলে যায়, যা সংঘর্ষের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও তিমিদের আচরণ বদলাচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে হাম্পব্যাক তিমিরা দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে নতুন করে খাবার খুঁজতে শুরু করেছে, যেখানে এখন জাহাজ চলাচল সবচেয়ে বেশি।

১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সাউদার্ন রাইট তিমিদের ৯৭টি মৃত্যুর মধ্যে অন্তত ১১টি সরাসরি জাহাজের ধাক্কায় হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আরও ১৬টি তিমির শরীরে জাহাজের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গবেষকরা মনে করেন, আসল সংখ্যা আরও অনেক বেশি, কারণ অনেক তিমি মাঝসমুদ্রে মারা গেলে শরীর সমুদ্রের তলায় তলিয়ে যায়, আর খুঁজেই পাওয়া যায় না।

সমাধানের পথ

তবে সমাধানেরও পথ আছে। গবেষকদের প্রস্তাব—জাহাজের রুট যদি উপকূল থেকে সামান্য দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কিছু প্রজাতির তিমির মৃত্যুর ঝুঁকি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব। জাহাজের গতি কমানো, তিমির অবস্থান জানিয়ে রেডিও বার্তা পাঠানোসহ বিভিন্ন উপায় নিয়ে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সুইজারল্যান্ডের এমএসসি কোম্পানি গ্রিস ও শ্রীলঙ্কায় তিমি সুরক্ষায় রুট পরিবর্তন শুরু করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

যুদ্ধের দূরবর্তী আঁচ যে কীভাবে প্রকৃতির সবচেয়ে নিরীহ প্রাণীগুলোকেও বিপদে ফেলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার তিমিরা তারই জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠছে।