সামান্য কারণে সহিংসতা: হতাশা, অর্থনৈতিক চাপ ও বিচারহীনতার সংকট
সামান্য কারণে সহিংসতা: হতাশা ও অর্থনৈতিক চাপের সংকট

এক টুকরো মুরগির রোস্ট, কয়েক টুকরো গরুর মাংস, আম পাড়া, মিছিলের রশি ধরা, কিংবা ধূমপান—ঘটনাগুলো আলাদা, স্থানও আলাদা। কিন্তু পরিণতি প্রায় একই। প্রথমে কথা-কাটাকাটি, এরপর উত্তেজনা, তারপর হাতাহাতি, সংঘর্ষ, গুলি, ছুরিকাঘাত। কোথাও আহত, কোথাও প্রাণহানি। সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষের এই দ্রুত উত্তেজিত হয়ে ওঠা এখন আর নিছক বিচ্ছিন্ন সামাজিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এর ভেতরে জমে থাকা হতাশা, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, বিচারহীনতার ধারণা, মাদকের প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহিংস ভাষা এবং সহনশীলতার ঘাটতির মতো সংকটগুলো কাজ করছে।

তুচ্ছ ঘটনায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সেই অস্থিরতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত মাসের ৫ জুন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার দাশপাড়া ইউনিয়নের ‘মোল্লা বাড়ির পোল’ এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে খাবার পরিবেশনের সময় অতিরিক্ত মুরগির রোস্ট চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আনন্দঘন বিয়ে বাড়ি মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাগবিতণ্ডা থেকে হাতাহাতি, এরপর সংঘর্ষে আহত হন তিন জন। পরে স্থানীয়রা তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।

এর কয়েক দিন পর, ৯ জুন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের দেওড়া নয়াকান্দি গ্রামে আরেকটি বিয়ে বাড়িতে কয়েক টুকরা গরুর মাংস কম দেওয়া নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। কনেপক্ষের আমন্ত্রিত গ্রামবাসীর কয়েকজন খাবারে মাংস কম দেওয়ার অভিযোগ তুললে প্রথমে উভয়পক্ষের মাঝে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। লাঠি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে অন্তত ১১ জন আহত হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আম পাড়া থেকে হত্যা, ধূমপান থেকে গুলি

শুধু বিয়ে বাড়ি নয়, পারিবারিক বিরোধ বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মতো জায়গাতেও তুচ্ছ কারণ বড় সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। ২৭ জুন রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের হরিহরপাড়া গ্রামে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও গাছ থেকে আম পাড়াকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের সংঘর্ষে আব্দুর রাজ্জাক নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। একই ঘটনায় আহত হন আরও কয়েকজন।

২৬ জুন পবিত্র আশুরা উপলক্ষে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে তাজিয়া মিছিলে ডুলির রশি ধরা নিয়ে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতির জেরে মো. জাকির হোসেন নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। একই দিন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে ধূমপানকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে ছররা গুলিতে ছয় জন আহত হন। পুলিশ জানায়, কয়েকজন যুবক দোকানের সামনে সিগারেট খাচ্ছিলো। এলাকার প্রবীণরা তাতে বাধা দিলে দুপক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এর জেরেই পরদিন রাতে হামলার ঘটনা ঘটে।

এর আগের দিন, ২৫ জুন রাতে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের দুইপক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। পরে সেই বিরোধে তরুণরাও জড়িয়ে পড়ে। তর্কাতর্কির একপর্যায়ে ছররা গুলি ছোড়া হলে ইউনিয়ন পর্যায়ের এক ছাত্রদল নেতা আহত হন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ: হতাশা সহ্যের ক্ষমতা কমছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনার দৃশ্যমান কারণ তুচ্ছ হলেও এর পেছনের সংকট গভীর। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''কোনও প্রত্যাশা পূরণ না হলে মানুষের মধ্যে হতাশা, রাগ বা মানসিক চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই রাগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়।'' তার ভাষায়, অল্পতেই গায়ে হাত তোলা, মারামারিতে জড়িয়ে পড়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখানো—এসব আচরণ কমে যাওয়া 'ফ্রাস্ট্রেশন টলারেন্স' বা হতাশা সহ্য করার ক্ষমতার প্রতিফলন।

তিনি বলেন, ''এটিকে সরাসরি মানসিক রোগ বলা যাবে না। তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অপ্রাপ্তিকে মেনে নেওয়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে পরিবারে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ভাই-ভাই সংঘর্ষ, বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে সহিংসতা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বেড়েছে।''

ডা. মেখলা সরকারের মতে, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনও বড় কারণ। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার বাড়ায় ব্যক্তিস্বার্থ, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং নিজের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। আবার অনেক পরিবারে সন্তানের চাহিদা পূরণে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া হয়। কিন্তু সীমারেখা শেখানো হয় না। ফলে শিশু বড় হয়ে অপ্রাপ্তি মেনে নিতে শেখে না। ছোটবেলা থেকে যদি সন্তান দেখে—রাগ হলেই বাবা-মা চিৎকার করছেন বা গায়ে হাত তুলছেন, তবে সেও সেই আচরণ অনুকরণ করে।

তিনি আরও বলেন, 'গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার অতিরিক্ত উপস্থিতিও আচরণে প্রভাব ফেলছে। বারবার মারামারি, ভাঙচুর, যুদ্ধ বা আক্রমণাত্মক ভাষা দেখতে দেখতে সহিংসতা অনেকের কাছে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠছে। এতে সহমর্মিতা কমছে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রবণতা বাড়ছে।'

মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষণ: বহুমাত্রিক সংকট

মানবাধিকারকর্মী ইজাজুল ইসলাম বলেন, 'সাম্প্রতিক সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক সহিংসতা, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যাবে না। এগুলো সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানসিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সম্মিলিত প্রতিফলন।' তার মতে, আইনের শাসনের দুর্বলতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা। সব মিলেই মানুষের মধ্যে সহিংস আচরণ বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'সমাজের প্রায় সব স্তরেই অস্থিরতা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও একক পরিবার বৃদ্ধির ফলে শিশুর বেড়ে ওঠায় প্রয়োজনীয় পারিবারিক নজরদারি, স্নেহ, যোগাযোগ ও মূল্যবোধচর্চা অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। এতে বাবা-মা ও সন্তানের বন্ধন দুর্বল হচ্ছে—যা আচরণ, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।'

তিনি বলেন, 'মাদকের বিস্তারও সহিংসতার বড় কারণ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি অনেক সময় ধৈর্য হারিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ক্ষণিকের উত্তেজনাতেই তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। তাই পরিবারে সন্তানদের সময় দেওয়া, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথম অপরাধের বিচার না হলে অনেকেই পরে অভ্যাসগত অপরাধীতে পরিণত হয়।'

পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি: শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, 'পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, মূল্যবোধ, সচেতনতা ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে এসব ঘটনার যোগ আছে।'

তিনি বলেন, 'সামান্য কথা-কাটাকাটিকে কেন্দ্র করে এখন প্রতিবেশীদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে, কোথাও হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। পরিবারে বাবা-মা, সন্তান ও ভাইবোনের মধ্যেও সহিংসতা বাড়ছে। অপরাধ ঘটলে পুলিশ মামলা নিতে পারে, জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পারে। কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।'

তার মতে, কমিউনিটি পুলিশিং, উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা ও আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে মানুষকে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সচেতন আচরণের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে শুধু পুলিশের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না, পরিবার ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে।