বজরংগী ভাইজানের বাস্তব রূপ: সাত মাস পর বাবার কোলে ফিরল নবজাতক ‘আপন’
সীমান্ত পেরিয়ে বাবার কোলে: সাত মাস পর মিলন

বুধবার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর ইমিগ্রেশন দিয়ে মো. দানেশ শেখ, সুইটি বিবি ও তাদের দুই সন্তান কুরবান শেখ ও ইমাম হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল দানেশ শেখের জন্য, কারণ তার ছোট ছেলে ‘আপন’-এর জন্ম হয়েছিল যখন তিনি বাংলাদেশে বিএসএফের জোরপূর্বক ‘পুশইন’-এর শিকার হয়ে আটকে ছিলেন।

পরিবারের বিচ্ছেদের গল্প

২০২৫ সালের ১৭ জুন দিল্লির রোহিণী এলাকা থেকে পরিচয় যাচাইয়ের নামে পরিবারটিকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। আধার কার্ডসহ প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ২৫ জুন কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে পুশইন করে। তখন দানেশ শেখের স্ত্রী সোনালী খাতুন প্রায় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

বাংলাদেশে প্রবেশের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন তারা। গত বছরের ২২ আগস্ট আদালতের নির্দেশে তাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। সে সময় সোনালী খাতুন প্রায় ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনি লড়াই ও আদালতের নির্দেশ

সোনালী খাতুনের বাবা ভোদু শেখ কলকাতা হাইকোর্টে একটি হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তারা পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ভারতীয় নাগরিক। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত বাতিল করে চার সপ্তাহের মধ্যে তাদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। চার দিন পর, ৩০ সেপ্টেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতও নথিপত্র পর্যালোচনা করে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নির্দেশ দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরে মামলাটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে গড়ায়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চে শুনানিকালে ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, মানবিক বিবেচনায় সোনালী খাতুন ও তার সন্তানকে ফিরিয়ে আনা হবে। গত বছরের ২ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে তাদের স্থানীয় জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়। পরে ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সোনালী খাতুন ও তার ছেলে সাব্বিরকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে বিজিবি। তবে স্বামী দানেশ শেখসহ পরিবারের বাকি চার সদস্যকে সে সময় ভারত গ্রহণ করেনি।

নবজাতক ‘আপন’-এর জন্ম ও নামকরণ

ভারতে ফিরে এ বছরের ৫ জানুয়ারি রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন সোনালী খাতুন। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে নবজাতকের নাম রাখেন ‘আপন’। বাবাকে না দেখেই জীবনের প্রথম সাত মাস কাটে শিশুটির। বুধবার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়।

মানবিক বার্তা ও বাস্তবতার নির্মমতা

বজরংগী ভাইজান চলচ্চিত্রে বোবা শিশু মুন্নিকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে মানবিক বার্তা উঠে আসে, বাস্তবের এই ঘটনাও যেন একই প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্রের সীমানা কি কখনও মানুষের সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে পারে? তবে বাস্তবতার নির্মমতাও এখানে স্পষ্ট। সিনেমার মতো কয়েক দিনের অভিযানে নয়, এই পরিবারের ঘরে ফেরার জন্য লড়তে হয়েছে আদালতে, কাটাতে হয়েছে কারাগারে, আর অপেক্ষা করতে হয়েছে মাসের পর মাস।

সবশেষে পরিবারের বাকি চার সদস্যকেও আনুষ্ঠানিক ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া শেষে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে বিজিবি এ ধরনের ‘পুশইন’-এর ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছিল। তবে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরলেও পরিবারের সংগ্রাম পুরোপুরি শেষ হয়নি।

ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—সীমান্তের দুই পাশের মানুষের ভাষা, ধর্ম কিংবা জাতীয়তা ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু একজন মায়ের অপেক্ষা, একজন বাবার সন্তানের জন্য আকুলতা কিংবা একটি শিশুর প্রথমবার বাবাকে জড়িয়ে ধরার আনন্দের কোনো সীমান্ত নেই।