১৯৯১ সালের পর এবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হতে যাচ্ছে। গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা নোয়ার (NOAA) বিজ্ঞানী ন্যাট জনসন একটি চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারেন। তিনি তাঁর জলবায়ু মডেল বা পূর্বাভাস দেওয়ার কম্পিউটার প্রোগ্রাম থেকে এ তথ্য পান। প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব দিকের ক্রান্তীয় অঞ্চলের পানি যখন অস্বাভাবিক গরম হয়ে যায়, তখন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার বড় পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় এল নিনো। তবে ন্যাট জনসনের কম্পিউটার মডেলটি এবার একটি বড় পূর্বাভাস দিয়েছে। মডেল ডেটা অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের পর এবার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হতে যাচ্ছে।
শক্তিশালী এল নিনোর পূর্বাভাস
এর আগে কেবল ১৯৯৭ সালে এমন শক্তিশালী এল নিনো দেখা গিয়েছিল। সেই সময়ে এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা, বন্যা এবং নানা ধরনের চরম আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল। তাই মডেলের তথ্য দেখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এবারও আবহাওয়া অনেক অস্বাভাবিক রূপ নিতে চলেছে। সেই পূর্বাভাসের সত্যতা এখন প্রমাণিত হচ্ছে। নোয়ার সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, এল নিনো ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মহাসাগরের উষ্ণ পানি এখন পেরুর উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে। যেখানে সাধারণত ঠান্ডা পানি থাকার কথা ছিল। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এ বছরের শেষের দিকে এই এল নিনোটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ, যা গত মে মাসের পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব
নোয়া জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরের মধ্যে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া ওলটপালট হয়ে যাবে। দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব আফ্রিকা ও চীনে তীব্র বন্যা এবং ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় খরা বা দাবানলের ঝুঁকি দেখা দেবে। পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় বাড়বে। আর বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এবার এল নিনোর ব্যতিক্রমী শক্তির বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত। বিজ্ঞানী এমিলি বেকার জানান, এবারের পূর্বাভাসে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের বাস্তব তথ্যের পাশাপাশি কম্পিউটারের জলবায়ু মডেল এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতকে একসঙ্গে কাজে লাগানো হয়েছে। অতীতে মডেলের ফলে কিছু ভুল থাকলেও, এবারের মতো এত স্পষ্ট ও শক্তিশালী রূপ আগে কখনো দেখা যায়নি।
পূর্বাভাসের চ্যালেঞ্জ
বসন্তকালের ক্ষণস্থায়ী ঝড়–বাতাস এল নিনোকে শক্তিশালী বা দুর্বল করে দেয়। বর্তমান প্রযুক্তিতে কয়েক মাস আগে থেকে এই বাতাসের নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া অসম্ভব হওয়ায় এল নিনোর সঠিক বিস্তার জানা এত দিন কঠিন ছিল। তবে এ বছর প্রধান বায়ুপ্রবাহগুলো সক্রিয় হয়ে এল নিনোকে আরও শক্তিশালী করছে। পাপুয়া নিউগিনির কাছে একসঙ্গে তৈরি হওয়া তিনটি ঘূর্ণিঝড় পশ্চিমা বাতাসকে আরও গতিশীল করেছে।
আগামী দিনগুলোতে এল নিনোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন হবে। প্রশান্ত মহাসাগরটি পৃথিবীর সব স্থলভাগের চেয়েও বড় হওয়ায় সেখানে ছড়ানো শত শত ভাসমান যন্ত্র দিয়ে নিখুঁত তথ্য পাওয়া কঠিন। এর ওপর বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সাগরের তাপমাত্রা এমনিতেই বাড়ছে। ফলে সাগরের এই সাধারণ উষ্ণতার মধ্যে এল নিনোর নিজস্ব গরম সংকেত আলাদা করে চেনা বিজ্ঞানীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন পরিমাপ পদ্ধতি
এই সমস্যা দূর করতে রিলেটিভ ওশেনিক নিনো ইনডেক্স (RONI) নামের একটি নতুন পরিমাপ পদ্ধতি সাহায্য করছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা যখন এর গত ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়, তখন তাকে এল নিনো বলা হয়। কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিটি কেবল প্রশান্ত মহাসাগর নয়, বরং এটিকে বিশ্বের অন্য সব মহাসাগরের তাপমাত্রার সঙ্গে তুলনা করে। এর ফলে বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সাগরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং এল নিনোর কারণে তৈরি হওয়া বাড়তি তাপমাত্রা দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে চেনা যায়। নোয়া এ বছরই প্রথম এই পরিমাপ পদ্ধতিটি ব্যবহার শুরু করেছে।
বিজ্ঞানীদের সতর্কতা
তবে একটি শক্তিশালী এল নিনো শুরু হতে যাচ্ছে বললে এর সব প্রভাব সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত হওয়া যায় না। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী মাইকেল টিপেট বলেন, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়াটা সরাসরি সাগরের মাছের ওপর প্রভাব ফেলে। আসল চিন্তার বিষয় হলো, এর ফলে বিশ্বের বাকি অংশের আবহাওয়া ও মানুষের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা ঠিকভাবে জানা।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, এল নিনোর মূল ধরন এক হলেও এর খুঁটিনাটি প্রভাব প্রতিবার আলাদা হয়। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা ও শক্তি বেশি থাকায় এল নিনোর ফলে চরম আবহাওয়া আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। বিজ্ঞানী ন্যাট জনসন আশঙ্কা করছেন, এল নিনো ও জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ ধাক্কায় প্রবাল প্রাচীর, মৎস্যক্ষেত্র ও আমাজনের মতো খরাকবলিত এলাকাগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। এর প্রভাবে ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হতে পারে।
বিজ্ঞানী এমিলি বেকার জানান, ১৯৫০ সালের পর থেকে এত দ্রুত লা নিনা থেকে শক্তিশালী এল নিনোতে রূপ নেওয়ার ঘটনা আর দেখা যায়নি। এই দ্রুত পরিবর্তন আধুনিক জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কম্পিউটার মডেলগুলোর এমন জোরালো পূর্বাভাসকে হালকাভাবে না নিয়ে গবেষকেরা বিশ্ববাসীকে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকার স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন।



