জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বিপন্ন লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় বিশ্বনেতাদের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এখন সময় এসেছে জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে কাজে এবং অঙ্গীকারকে ফলাফলে পরিণত করার, যাতে বিশ্ব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যৎকে আলিঙ্গন করতে পারে। আমরা আশা করি, কপ-৩১ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে এবং বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অধিবেশনে বক্তব্য
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, মঙ্গলবার (২৩ জুন) চীনের দালিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এর ‘শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপে ক্লাইমেট লিডারশিপ’ শীর্ষক অধিবেশনে উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে জলবায়ু কার্যক্রম কোনও ব্যয় নয়; বরং এটি সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং একটি যৌথ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে উপস্থিত সকলে মিলে একটি সবুজ, নিরাপদ, টেকসই এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, কোনও দেশ একা জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং যৌথ অঙ্গীকার।
কপ-৩১ ও কপ-৩২ সামনে রেখে তিন অগ্রাধিকার
কপ-৩১ ও কপ-৩২ সামনে রেখে তিনটি অগ্রাধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য সহায়তাসহ ক্ষয়ক্ষতি তহবিলকে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরও সহজলভ্য, সহজসাধ্য ও চাহিদাভিত্তিক করতে হবে। একইসঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও ত্বরান্বিত করতে হবে। এ জন্য ‘সবুজ জলবায়ু তহবিল’ (জিসিএফ)-এর বৃহত্তর সংহতকরণ ও কার্যকরীকরণের প্রয়োজন রয়েছে।
তৃতীয়ত, প্রশমনের পাশাপাশি অভিযোজনও অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন কোনও নীতিগত বিকল্প নয়, বরং এটি অত্যাবশ্যক। ইউএনসিটিএডি’র হিসাবে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন সম্মিলিত পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা (এনসিকিউজি) উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশমন ও অভিযোজনের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের জলবায়ু উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আজ এখানে শুধু জলবায়ু সংকটে সম্মুখসারির একটি রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক সমাধানে আগ্রহী একটি জাতি হিসেবেও উপস্থিত হয়েছি। তিনি বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার একটি অগ্রণী জলবায়ু-সহনশীল জাতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিবেশ সুরক্ষা, টেকসই উন্নয়ন এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি এখন দেশের উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
জলবায়ু মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, কৃষি সহায়তা এবং জলবায়ুগত অভিঘাত মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ব্যারেজ আধুনিকীকরণে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বনায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি
তিনি আরও বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের অঙ্গীকার করেছে সরকার। ‘এক শিক্ষার্থী, এক গাছ’ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে বনাঞ্চল সম্প্রসারণ, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার, সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাপমাত্রা হ্রাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বন, জলাভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা হচ্ছে এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ মান চালু করা হয়েছে।
এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর, বায়ু, বর্জ্য থেকে শক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে দেশের অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাটজাত পণ্য ও বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ পরিবেশবান্ধব শিল্পকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সবুজ বিনিয়োগ ও কার্বন ক্রেডিটের সুযোগ বাড়াতে একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। একইসঙ্গে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার, জৈব সার উৎপাদন এবং চক্রাকার অর্থনীতির মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সবুজ উৎপাদনে অগ্রগতি
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সবুজ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড প্রত্যয়িত কারখানার মধ্যে ৬৯টিই বাংলাদেশের।
বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বনেতাদের অবশ্যই মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে লাখ লাখ মানুষের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। কপ-৩১-এর উচিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কাঠামো কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) ও প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য ও চেতনাকে পুনরায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপকে উৎসাহিত করতে, ঐকমত্য গড়ে তুলতে এবং সম্মিলিত পদক্ষেপকে অনুপ্রাণিত করার জন্য একটি মূল্যবান মঞ্চ।



