জলবায়ু পরিবর্তনে তাপানুলি ওরাংওটানের ৭% মৃত্যু, বিলুপ্তির ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনে তাপানুলি ওরাংওটানের ৭% মৃত্যু

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হওয়া রেকর্ড বৃষ্টি ও ভয়াবহ ভূমিধসে পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল প্রজাতির ওরাংওটানের প্রায় সাত শতাংশ মারা গেছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে, যা এই প্রাণীটির পৃথিবীতে টিকে থাকার চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

গবেষণার ফলাফল

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘কারেন্ট বায়োলজি’ জার্নালে। গবেষণা থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রা প্রদেশে মাত্র চার দিনে রেকর্ড পরিমাণ অর্থাৎ ১ হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সেখানকার মহাবিপন্ন তাপানুলি ওরাংওটানের মাত্র ৮০০টি টিকে থাকা সদস্যের মধ্যে ৫৮টি মারা গেছে। এটি ওই অঞ্চলের ওরাংওটান সংখ্যার ১১ শতাংশ ও পৃথিবীতে টিকে থাকা এই পুরো প্রজাতির ৭ শতাংশের সমান।

গবেষকদের উদ্বেগ

‘কারেন্ট বায়োলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার অন্যতম গবেষক ও লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সার্জ উইচ জানিয়েছেন, ‘একসঙ্গে এতগুলো ওরাংওটানের মৃত্যু সত্যিই খুব বেদনাদায়ক। যে এলাকায় একটি প্রাণীর সংখ্যা এমনিতেই অনেক কম। আর এরা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের এমন ভয়াবহ রূপ পুরো প্রজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এই ওরাংওটানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা ভীষণ চিন্তিত।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ

বিজ্ঞানীরা বাটাং তোরু বনের পশ্চিম এলাকায় ওরাংওটানের প্রধান চারণভূমিতে ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারের প্রভাব বোঝার জন্য স্যাটেলাইট ছবির সাহায্য নিয়েছেন। তাঁরা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বনের ক্ষতির পরিমাণের সঙ্গে সেখানে থাকা ওরাংওটানের সংখ্যা মিলিয়ে দেখেছেন। এই বন খনি, পাম তেলের বাগান এবং একটি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে আগেই বেশ হুমকির মুখে ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভূমিধসের ক্ষয়ক্ষতি

স্যাটেলাইট ছবি থেকে আরও দেখা গেছে, প্রবল বৃষ্টির পর হওয়া ভয়াবহ ভূমিধসে ওরাংওটানদের এই প্রিয় বনের প্রায় ৮ হাজার ৩০০ হেক্টর এলাকা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে, যা পুরো বনের প্রায় ১১.৭ শতাংশ। বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানুষের তৈরি পরিবেশদূষণ ও জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে জলবায়ু বদলে যাওয়ায় এই বৃষ্টির তীব্রতা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্য প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক জাতনা সুপ্রিয়াৎনা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হওয়া একটিমাত্র ভূমিধসের ঘটনায় প্রায় ৫৮টি তাপানুলি ওরাংওটানের মারা যাওয়াটা পৃথিবীর সবচেয়ে বিরল এই ওরাংওটানের জন্য এক বিরাট ধাক্কা।’ ইতিহাসে মানুষের চোখের সামনে কোনো বড় ওরাংওটান প্রজাতি যাতে চিরতরে হারিয়ে না যায়, সে জন্য ইন্দোনেশিয়াকে অবশ্যই বাতাং তোরু বনভূমিকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলেরও উচিত জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দেওয়া আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দ্রুত পূরণ করা।

বিলুপ্তির আশঙ্কা

এর আগের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর যদি এই তাপানুলি ওরাংওটানের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ করেও কমে যায়, তবেই এই পুরো প্রজাতিটি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার জন্য তা যথেষ্ট। তাপানুলি ওরাংওটানদের কীভাবে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়, তার সঠিক উপায় খুঁজে বের করতে এবং একই সঙ্গে মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমাতে বড় একটি পদক্ষেপ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া সরকার। তারা বাতাং তোরু এলাকার বড় বড় সব শিল্পকারখানার কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।

সংরক্ষণের পরামর্শ

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বোর্নিও ফিউচারস, ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন ও লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা একটি জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ওরাংওটানদের বনের ক্ষতি করে এমন সব কাজ যেন এখনই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। এর পাশাপাশি, এই প্রাণীগুলোর সংখ্যা আবার বাড়িয়ে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ওরাংওটানদের জন্য নিরাপদ সংরক্ষিত বনের সীমানা আরও বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন বিজ্ঞানীরা।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, লাইভ সায়েন্স