হরমুজ প্রণালি খুলছে, কিন্তু স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরবে কি?
হরমুজ প্রণালি খুলছে, কিন্তু স্বাভাবিকতা ফিরবে কি?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মতো একটি সমঝোতা হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে আবার তেল চলাচল শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—তা কতটা স্বাভাবিকভাবে চলবে?

যুদ্ধবিরতির শর্ত

এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে থাকা এই প্রণালি ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হবে। এই সময়ে কোনো টোল নেওয়া হবে না। ইরান নিজেই সেখানে পেতে রাখা মাইন সরানোর কাজ শুরু করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করবে।

এই ৬০ দিনের মধ্যে প্রণালি টোলমুক্ত থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এই সময়টায় দুই দেশ চেষ্টা করবে ইরানের মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে। যুক্তরাষ্ট্র এই আলোচনায় ইরানকে আরও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আশ্বাস দিচ্ছে, পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল অর্থ মুক্ত করে দেওয়ার প্রলোভনও দেখাচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা

তবে স্থায়ী চুক্তি আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ইরান ইতিমধ্যেই দাবি করেছে, তাদের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে। পাশাপাশি তারা বলছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য তারা টোল নেওয়ার অধিকার রাখে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে, শান্তিপূর্ণ কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তারা ছাড়বে না।

ধরা যাক, শেষ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী চুক্তি হয়, তবুও পুরো প্রণালি থেকে মাইন সরাতে অন্তত তিন মাস সময় লাগতে পারে। তার পর আটকে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোকে সরানো যাবে। আর যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তেল অবকাঠামো পুরোপুরি মেরামত করতে আরও অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বাসের সংকট

এমনকি স্থায়ী চুক্তি হলেও যুদ্ধের আগে যে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ছিল, তা হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না। কারণ ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, চাইলে তারা এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। আগে এমন ধারণা ছিল না। ফলে ভবিষ্যতে এই পথ সব সময় খোলা থাকবে—এই বিশ্বাস আর থাকছে না।

এই কারণেই বিমা খরচ এবং তেল পরিবহনের খরচ আগের তুলনায় বেশি থাকবে। যদি যুদ্ধবিরতির পর ইরান টোল চালু করে, তাহলে খরচ আরও বাড়বে।

বিকল্প পথের সন্ধান

মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল, তারাও এখন বুঝতে পারছে তাদের ঝুঁকি কতটা। তাই ইতিমধ্যেই বিকল্প পাইপলাইন তৈরির আলোচনা শুরু হয়েছে, যাতে এই প্রণালি এড়িয়ে তেল সরবরাহ করা যায়।

যুদ্ধের সময় তেল কূপ, শোধনাগার ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোর অনেক ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো পুরোপুরি সচল করতে মাসের পর মাস লাগবে। কাতারের রাস লাফান গ্যাস প্রকল্প, যা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা পুরোপুরি চালু হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।

বৈশ্বিক প্রভাব

এ ছাড়া তেল থেকে তৈরি সার ও অন্যান্য পণ্যের উৎপাদনও স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত সারের বাণিজ্য হতো। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সারের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর।

এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বকেই বদলে দিচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বেড়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আবার চালু করা হচ্ছে। নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা চলছে। নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝোঁকও দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, এ বছর তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল কমতে পারে।

অনেক দেশ এখন তেলের বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, যারা আগে পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভর করত, তারা এখন অন্য উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

এই পরিবর্তনগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কারণ সবাই বুঝে গেছে—হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় সংকটবিন্দু।

তেলের দামের ভবিষ্যৎ

চুক্তির খবর প্রকাশ পেতেই তেলের দাম কমে যায়। যদিও তার আগে ট্রাম্প বহুবার আগেভাগেই চুক্তির দাবি করেছিলেন। এখন প্রশ্ন—দাম কি আবার আগের মতো ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলারের নিচে নামবে? আপাতত তা অনিশ্চিত, বরং কম সম্ভাবনাই বেশি।

কারণ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাজার থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল তেল সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যদিও আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার উদ্যোগে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত থেকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তবুও সরবরাহের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

যদি যুদ্ধ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতো, তাহলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেলের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারত এবং দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারের বেশি হয়ে যেত।

এখন আবার মজুত বাড়াতে সময় লাগবে, যা তেলের দামের ওপর একটা স্থায়ী চাপ তৈরি করবে। ওপেক জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন বাড়াবে, যা কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবুও বছর শেষ পর্যন্ত চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতি

এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, সাধারণ মানুষের খরচ বেড়েছে। আফ্রিকার কিছু দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

মানবিক ক্ষতির দিক থেকেও এই যুদ্ধ ভয়াবহ। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইরান, লেবানন, ইসরায়েল এবং আশপাশের দেশগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—কমপক্ষে ১৩ জন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

প্রশ্ন উঠছে—এই যুদ্ধের শেষ ফল কী?

বারাক ওবামার সময়ে একটি চুক্তি হয়েছিল, যেখানে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা অস্ত্র তৈরির মতো মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি তারা মেনে চলছিল। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি বাতিল করে দেন।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, স্থায়ী চুক্তি করতে হলে হয়তো তাঁকেই ইরানের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে দিতে হবে—যা ওবামার দেওয়া অর্থের চেয়েও বেশি হতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপরও বড় চাপ পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে।

এখন ট্রাম্প এমন একটি চুক্তির কথা বলছেন, যেখানে একটি প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হচ্ছে, যা আগে কখনো বন্ধই হয়নি। আর একই সঙ্গে সেই পুরোনো সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছে, যা তাঁরই সিদ্ধান্তে আরও জটিল হয়েছিল। তিনি একসময় বলেছিলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলে দেবেন, তাদের ইউরেনিয়াম মজুত দখল করবেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির ক্ষমতা ধ্বংস করবেন এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব শেষ করবেন।

ট্রাম্প ভেবেছিলেন, এই যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হবে। কিন্তু ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

শেষ পর্যন্ত যদি কোনো চুক্তি হয়, তাতে অনেকেই মনে করবেন—এই যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয় ছিল এবং তার ফলাফল আগের চুক্তির তুলনায় আরও খারাপ।

স্টিফেন বার্থোলোমিউস, সিনিয়র বানিজ্য বিশ্লেষক। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।