জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের গবাদিপশু পালন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে
বিশ্বের একটি বিশাল অংশের গবাদিপশু পালন ব্যবস্থা মূলত নির্দিষ্ট জলবায়ুগত সহনশীল সীমার ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের বর্তমান তৃণভূমি বা চারণভূমির ৩৬ থেকে ৫০ শতাংশই গবাদিপশু পালনের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়তে পারে। এই পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
১০ কোটি পালক ও ১৬০ কোটি পশুর ওপর সরাসরি প্রভাব
এই সম্ভাব্য সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়বে প্রায় ১০ কোটিরও বেশি পশু পালক এবং প্রায় ১৬০ কোটি গবাদিপশুর ওপর। জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের গবেষক চাওহুই লির নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের তথ্যমতে, তৃণভূমিতে গরু, ভেড়া ও ছাগল বিচরণ করে তা মূলত তাপমাত্রা, বৃষ্টি এবং আর্দ্রতার একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্যের ওপর টিকে থাকে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিট স্ট্রেসের প্রভাব
কিন্তু দ্রুত বাড়তে থাকা তাপমাত্রা অনেক অঞ্চলকে পশু পালনের এই দীর্ঘকালীন অনুকূল পরিবেশ থেকে বিচ্যুত করছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বর্তমানে সহনশীল সীমার একদম শেষ প্রান্তে অবস্থান করছে। ফলে তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও সেখানে পশু পালন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে ঘাস ও পশু উভয়ের ওপরই। কারণ, অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতায় পশুরা হিট স্ট্রেসে ভোগে। এর ফলে তাদের প্রজননক্ষমতা কমে যায় ও তারা খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, বৃষ্টির অভাব ও শুষ্ক বাতাসে ঘাস শুকিয়ে যাওয়ায় খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
তৃণভূমির স্থানান্তর ও আফ্রিকার ক্ষতি
গবেষকদের ধারণা, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারযোগ্য তৃণভূমি ক্রমশ শীতল অক্ষাংশ এবং উঁচু পাহাড়ি এলাকার দিকে সরে যাবে। এর ফলে উত্তর এশিয়ার কিছু অংশ পশু পালনের জন্য নতুনভাবে উপযোগী হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু আফ্রিকার মতো অঞ্চল তাদের বিশাল চারণভূমি হারাবে। আফ্রিকা বর্তমানে পশু পালনের জন্য সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সীমায় রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে এই মহাদেশে তৃণভূমি হ্রাসের হার ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
মরুকরণ ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি
তৃণভূমি সংকুচিত হওয়ায় অবশিষ্ট জমিতে পশুর ঘনত্ব বেড়ে যাবে, যা অতিরিক্ত ঘাস খাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। এর ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হবে এবং মরুকরণ ত্বরান্বিত হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যেসব দেশে আগে থেকেই ক্ষুধা, বৈষম্য এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে তৃণভূমি নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার আহ্বান
এ সমস্যা সমাধানের বিষয়ে বিজ্ঞানী চাওহুই লি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে পশু পালনের জায়গাগুলোকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। এই সম্ভাব্য অস্তিত্ব রক্ষা সংকটের ক্ষতি কমাতে আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসতে হবে। এই গবেষণা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে।
