বাংলাদেশে বজ্রপাত: প্রকৃতির রুদ্ররোষে ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি ও প্রতিকার
বাংলাদেশে বজ্রপাত: ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি ও প্রতিকার

প্রকৃতির রুদ্ররোষের মধ্যে বজ্রপাত এখন বাংলাদেশের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা খরার মতো বজ্রপাত হয়তো সংবাদপত্রের শিরোনামে দীর্ঘস্থায়ী আলোচনার ঝড় তোলে না, কিন্তু প্রতি বছর এই নিঃশব্দ ঘাতকের থাবায় শত শত মানুষের প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর গড়ে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করলেও এই সমস্যার সমাধানে আমাদের প্রস্তুতি এখনও অপ্রতুল। প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রকোপ এত বেশি এবং ক্রমাগত বাড়ছে? এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—ভৌগোলিক, পরিবেশগত, প্রযুক্তিগত ও মানবসৃষ্ট।

ভৌগোলিক কারণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বজ্রপাতের জন্য এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এই দেশটি মৌসুমি বায়ু প্রবাহের মুখে থাকে। প্রাক-বর্ষা মৌসুমে, অর্থাৎ মার্চ থেকে মে মাসে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু হিমালয়ের ঠান্ডা বায়ুর সঙ্গে মিলিত হলে প্রচণ্ড বজ্রঝড়ের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম আর্দ্রতম দেশ হওয়ায় এখানে বজ্রমেঘ গঠনের সুযোগ অনেক বেশি।

জলবায়ু পরিবর্তনও এই বিপদ বৃদ্ধির জন্য বড় একটি কারণ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলীয় তাপমাত্রা বাড়ছে, ফলে সংবহনমূলক বজ্রঝড় আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হচ্ছে। গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি— তাই এই পরিসংখ্যান আমাদের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গাছপালা উজাড় ও মোবাইল টাওয়ারের ভূমিকা

গাছপালা উজাড় হওয়াও একটি বড় কারণ। একসময় গ্রামবাংলার মাঠ-ঘাট তালগাছে ভরা ছিল, যা প্রাকৃতিক বজ্র নিরোধকের ভূমিকা পালন করতো। কিন্তু নগরায়ণ ও কৃষিজমি সম্প্রসারণের ফলে সেই গাছগুলো আজ বিলুপ্তির পথে। ফলে বজ্রপাত সরাসরি মানুষ ও গবাদিপশুর ওপর আঘাত করার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে আধুনিক সময়ে যে কারণটি নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়, তা হলো—দেশজুড়ে মোবাইল টেলিযোগাযোগ টাওয়ারের অপরিকল্পিত বিস্তার। গত দুই দশকে বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে-গঞ্জে, হাওরের মধ্যখানে, এমনকি ফসলি জমির আইলেও উঁচু মোবাইল টাওয়ার স্থাপিত হয়েছে। এই ধাতব টাওয়ারগুলো বজ্রপাতের জন্য একটি শক্তিশালী পরিবাহী বা কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ মেঘ থেকে বৈদ্যুতিক চার্জ এই টাওয়ারের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং সেখান থেকে আশেপাশের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় টাওয়ারের কাছাকাছি থাকা মানুষ ও গবাদিপশু এই ভূ-সংবাহিত বিদ্যুতের শিকার হন। এছাড়া টাওয়ারগুলোতে সঠিক আর্থিং বা গ্রাউন্ডিং ব্যবস্থা না থাকলে বিপদ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এই ব্যাপারে বিধিমালা করলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।

প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

বজ্রপাতের ক্ষতি কেবল প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতি বছর বহু কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ মাঠে বা উন্মুক্ত স্থানে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। বেঁচে যাওয়া অনেকে স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বাকি জীবন কাটান—শ্রবণশক্তি নষ্ট হওয়া, পক্ষাঘাত, স্মৃতিভ্রংশ ও দৃষ্টিশক্তি হারানো এই মানুষদের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। মৃতদের পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যিনি মারা যান, তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গবাদিপশুর মৃত্যু এবং ফসলের ক্ষতিও কৃষকের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

সামাজিক প্রভাব ও দারিদ্র্যের চক্র

বজ্রপাতের সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে আমাদের সমাজে এখনও তেমন গভীর আলোচনা হয় না, অথচ এই প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও মর্মন্তুদ। একজন কৃষক বা শ্রমিকের বজ্রপাতে মৃত্যুর অর্থ শুধু একটি জীবনের অবসান নয়—তার পেছনে থেকে যায় এক ছিন্নমূল পরিবার। স্ত্রী হয়ে পড়েন নিঃসহায়, সন্তানেরা ঝরে পড়েন শিক্ষার বাইরে, পরিণত হন শিশুশ্রমিকে। এভাবে বজ্রপাত দারিদ্র্যের একটি নতুন চক্র তৈরি করে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়।

হাওর অঞ্চলের মতো ভূমিতে যেখানে নারীরা ঘরে থেকে সংসার সামলান, সেখানে স্বামী হারানো মানে রাতারাতি পথে বসে যাওয়া। এই বিধবা নারীরা প্রায়ই পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পান না এবং তারা মানসিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হন। শিশুরা পিতৃহারা হওয়ায় তাদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক ট্রমা প্রজন্মান্তরে বহন করা হয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বজ্রপাতভীতি এতটাই প্রকট যে ঝড়ের মৌসুমে অনেক মানুষ জরুরি কৃষিকাজ থেকেও বিরত থাকেন, ফলে ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ভয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে পরোক্ষভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।

প্রতিকার ও করণীয়

বজ্রপাতের বিরুদ্ধে লড়াই অসম্ভব নয়, তবে তার জন্য প্রয়োজন সুসমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, বজ্র নিরোধক দণ্ড বিদ্যালয়, হাটবাজার, খেলার মাঠ, নৌঘাট ও উন্মুক্ত কৃষিভূমিতে ব্যাপকভাবে স্থাপন করতে হবে। একইসঙ্গে মোবাইল টাওয়ারগুলোতে যথাযথ আর্থিং ও বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এই বিষয়ে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তালগাছ ও অন্যান্য উঁচু গাছ রোপণ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। হাওর অঞ্চলের বাঁধে, রাস্তার দুই পাশে ও মাঠের আশপাশে তালগাছ লাগানো শুধু বজ্রপাত রোধেই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তৃতীয়ত, দুর্যোগ পূর্বাভাস ও সতর্কতা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। মোবাইল ফোনে এসএমএস সতর্কতা, কমিউনিটি রেডিও ও সাইরেনের মাধ্যমে মানুষকে আগেভাগে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সাহায্য করা যায়। বজ্রঝড়ের সময় কী করণীয়—মাঠে না থাকা, গাছের নিচে না দাঁড়ানো, পানির কাছে না যাওয়া—এই সাধারণ সতর্কতাগুলো স্কুল পাঠ্যক্রম ও মসজিদের খুতবায় প্রচার করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

চতুর্থত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসনে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে বিধবা নারী ও এতিম শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একটি বজ্রপাত একটি পরিবারকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে না পারে।

বজ্রপাত আমাদের কাছে হয়তো ভাগ্যের খেলা মনে হয়। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে এই দুর্যোগকে নিয়তি ভেবে বসে থাকার কোনও সুযোগ নেই। প্রতিটি মৃত্যুই একটি পরিবারের সর্বনাশ, একটি স্বপ্নের অন্তিম। রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, বিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষ—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা যায়, কিন্তু এর কারণে মানুষের মৃত্যুকে অবহেলার দুর্যোগও বলা যায়। সেই অবহেলার ইতি টানার দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর