জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব যখন কার্বন-মুক্ত জ্বালানির সন্ধান করছে, তখন পারমাণবিক শক্তি একটি শক্তিশালী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু এই শক্তি কীভাবে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয় এবং এর জ্বালানি চক্র কী—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে।
পারমাণবিক শক্তি কী?
পারমাণবিক শক্তি মূলত পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত শক্তি। এটি দুইভাবে পাওয়া যায়: নিউক্লিয়ার ফিশন (নিউক্লিয়াস বিভক্ত হওয়া) এবং নিউক্লিয়ার ফিউশন (নিউক্লিয়াস একত্রিত হওয়া)। বর্তমানে বিশ্বের সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রই নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় চলে।
নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়া
নিউক্লিয়ার ফিশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি বড় পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে ছোট অংশে বিভক্ত হয় এবং বিপুল শক্তি উৎপন্ন করে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর নিউক্লিয়াসে একটি নিউট্রন আঘাত করলে এটি বেরিয়াম ও ক্রিপ্টনের মতো দুইটি ছোট নিউক্লিয়াসে বিভক্ত হয় এবং অতিরিক্ত নিউট্রন নির্গত করে। এই নিউট্রনগুলো অন্য ইউরেনিয়াম পরমাণুকে বিভক্ত করে, যা দ্রুত একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের ভেতরে ফিশন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ পানি গরম করে বাষ্প তৈরি করে। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং টারবাইন জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই এখানে তাপ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তবে পার্থক্য হলো জ্বালানি হিসেবে পারমাণবিক উপাদান ব্যবহৃত হয়।
ইউরেনিয়াম ও জ্বালানি চক্র
ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত ধাতু। এর প্রধান দুটি আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮ ও ইউরেনিয়াম-২৩৫। ইউরেনিয়াম-২৩৫ দিয়েই ফিশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন সম্ভব, কিন্তু এর প্রাকৃতিক পরিমাণ খুবই কম। তাই সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর ঘনত্ব বাড়ানো হয়। এই জ্বালানি কয়েক বছর ব্যবহারের পরও তেজস্ক্রিয় থাকে, তাই নিরাপদে সংরক্ষণ বা পুনঃব্যবহার করা হয়।
তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কিছু তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়, তবে এর পরিমাণ তুলনামূলক কম। এই বর্জ্যগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয় যাতে পরিবেশের ক্ষতি না হয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পুনর্ব্যবহারও সম্ভব। আগামী দিনের উন্নত রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি আরও নিরাপদ হবে এবং কম বর্জ্য তৈরি করবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের পর থেকে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনে পারমাণবিক শক্তির ভূমিকা
পারমাণবিক শক্তি একটি স্বল্প-কার্বন নির্গমনকারী উৎস। কয়লা বা গ্যাসের মতো এতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রায় নির্গত হয় না। বিশ্বের মোট স্বল্প-কার্বন বিদ্যুতের একটি বড় অংশই আসে পারমাণবিক উৎস থেকে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)



