মো. মহিউদ্দিন রুবেল, সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ
ডিকার্বনাইজেশন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শিল্পকারখানা ও সমাজব্যবস্থা থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো বা পুরোপুরি নির্মূল করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ডিকার্বনাইজেশন’। সহজ কথায়, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যাওয়ার রূপান্তর এটি। কার্বন নিঃসরণ কমানোর এই বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছে ইউরোপ। তাদের উচ্চাভিলাষী ‘ইইউ গ্রিন ডিল’-এর পাশাপাশি করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি রিপোর্টিং ডিরেক্টিভ (সিএসআরডি), কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম), ইকোডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রোডাক্টস রেগুলেশন (ইএসপিআর) এবং ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্টের (ডিপিপি) মতো বাধ্যতামূলক বিধিবিধানগুলো এটির মূল চালিকা শক্তি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ৫৫ শতাংশ কমানো। আর ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা (কার্বন নিউট্রালিটি) অর্জন। এই লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহকারীরা সংশ্লিষ্ট সব কোম্পানিকে এখন অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজেদের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ পরিমাপ, প্রতিবেদন তৈরির পাশাপাশি তা কমানোর উদ্যোগ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
সিবিএএম: ইউরোপের নতুন নিয়ম ও বাংলাদেশের প্রভাব
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সিবিএএম নীতিমালার চূড়ান্ত বা আর্থিকভাবে বাধ্যতামূলক ধাপের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। তার কারণ, ইইউ বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউর বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৯৭১ কোটি (১৯.৭১ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট পোশাক রপ্তানির অর্ধেকের বেশি। ফলে ইউরোপের এই নতুন নিয়মকে কেবল সাধারণ কোনো নীতিগত বা নিয়ন্ত্রণমূলক রদবদল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইউরোপের বাজারে প্রবেশের শর্তে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন, যা মোকাবিলায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সিবিএএম কী এবং কেন?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ আইনি প্যাকেজ ‘ফিট ফর ফিফটি ফাইভ’–এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এই সিবিএএম। ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৫৫ শতাংশ কমিয়ে আনার বড় লক্ষ্য নিয়ে এই প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘কার্বন লিকেজ’ বা কার্বনের স্থানান্তর ঠেকানো। কড়া পরিবেশগত বিধিবিধান এড়াতে এবং অধিক মুনাফার আশায় অনেক কোম্পানি তাদের দূষণকারী কারখানাগুলো এমন সব দেশে সরিয়ে নিতে চায়, যেখানে পরিবেশ সুরক্ষা আইন তুলনামূলক শিথিল। এর ফলে ইইউর কার্বনমুক্ত করার মূল প্রচেষ্টাই বাধাগ্রস্ত হয়। আর এই ফাঁকফোকর পুরোপুরি বন্ধ করতেই মূলত নতুন এই নীতিমালার পথে হেঁটেছে ইউরোপ।
নতুন নিয়মের বিস্তারিত
নতুন নিয়মের ফলে এখন থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদেরও দেশীয় উৎপাদকদের সমান ‘কার্বন মূল্য’ পরিশোধ করতে হবে। এই নীতিমালার আওতায় আমদানিকারকদের প্রথমেই অনুমোদিত ‘সিবিএএম ঘোষণাকারী’ হিসেবে নিবন্ধিত হতে হবে এবং সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য উৎপাদনে নির্গত কার্বনের সঠিক ও যাচাইকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সেই কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ইইউর নিজস্ব কার্বন বাজারের (ইইউ ইটিএস) নিলাম দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানিকারকদের ‘সিবিএএম সনদ’ কিনে তা জমা দিতে হবে। কঠোর এই নিয়ম অমান্য করলে প্রতি টন অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের জন্য ১০০ ইউরো করে জরিমানা গুনতে হবে, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। এমনকি বারবার নিয়ম ভাঙলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞাও আসতে পারে।
সময়রেখা ও পরিধি
সিবিএএম নীতিমালার বাস্তবায়ন মূলত দুটি ধাপে এগোচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান প্রাথমিক বা ‘ট্রানজিশন’ পর্যায়ে আমদানিকারকদের কেবল কার্বন নিঃসরণের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন জমা দিতে হচ্ছে, যেখানে কোনো আর্থিক বাধ্যবাধকতা নেই। তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বার্ষিক প্রতিবেদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই এবং ইইউ নির্ধারিত মূল্যে সনদ কেনা বাধ্যতামূলক হয়েছে। বর্তমানে সিমেন্ট, লোহা ও ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সার, বিদ্যুৎ ও হাইড্রোজেন—এই ছয়টি খাত এই নিয়মের আওতাভুক্ত থাকলেও ২০২৮ সাল থেকে আরও ১৮০টি নতুন পণ্য এর অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে ইউরোপীয় কমিশন। যদিও তৈরি পোশাক খাত এখনো সরাসরি এটির আওতায় আসেনি, তবে ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা হতে যাওয়া কমিশনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা প্রতিবেদনেই চূড়ান্ত হবে যে পরবর্তী ধাপে পোশাক খাত এর আওতায় পড়বে কি না। মূলত ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকসহ উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী সব খাতকেই এই কাঠামোর অধীন নিয়ে আসাই ইইউর চূড়ান্ত লক্ষ্য।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের চার-পঞ্চমাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার অর্ধেকের বেশি যায় ইউরোপের বাজারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বন নিঃসরণের বর্তমান চিত্র অব্যাহত থাকলে এবং পোশাক খাত সিবিএএমের আওতায় এলে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ ‘সিবিএএম শুল্ক’ আরোপিত হতে পারে। এই শুল্কের খড়্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ঝুঁকি। বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য–সুবিধা বা জিএসপি বাতিল হয়ে যাবে (যদিও এরপর তিন বছরের একটি ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা বাড়তি সময় পাওয়া যাবে)। এর মধ্যে নতুন কোনো শুল্কমুক্ত বাণিজ্যচুক্তি না হলে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ হারে সাধারণ শুল্ক গুনতে হবে। এর সঙ্গে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ সিবিএএম শুল্ক যুক্ত হলে মোট শুল্কভার দাঁড়াতে পারে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এটি কার্যকর হলে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের পোশাক মারাত্মকভাবে সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।
উদ্বেগের বিষয়
উদ্বেগের বিষয় হলো, তৈরি পোশাক খাত সিবিএএমের আওতায় আসার আগেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় এরই মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন থেকেই সরবরাহকারীদের কাছে কার্বন নিঃসরণের তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাইছেন। যেসব কারখানার কার্বন নিঃসরণ কম, তথ্যভান্ডার মজবুত কিংবা যারা স্বেচ্ছায় সিবিএএম পোর্টালে নিবন্ধিত হচ্ছে, ক্রেতারা তাদেরই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে সনদ কেনার বাড়তি খরচের আশঙ্কায় ইইউ বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে অনেকে। অনেকে ইতিমধ্যে বুঝতে শুরু করেছে, এগুলো নিছক ভবিষ্যতের কোনো শঙ্কা নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যের রূঢ় বাস্তবতা।
কাঠামোগত ব্যবধান ও করণীয়
এই চ্যালেঞ্জের মূল জায়গাটি আসলে কাঠামোগত। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৯৫ শতাংশই এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। মোট বিদ্যুতের মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি আসে নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে, যা বিশ্বের শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। এর ওপর সোলার প্যানেল স্থাপনের সরঞ্জামে (মাউন্টিং) ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ব্যাটারি আমদানিতে ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান। এই বিপুল শুল্ক পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত জরুরি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের পথে সরাসরি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ‘লিড’ সনদ পাওয়া পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে লিড সনদ মূলত কারখানার অবকাঠামোগত দক্ষতার ওপর জোর দেয়, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিবিএএম নীতিমালার কার্বন নিঃসরণ শর্ত পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। সিবিএএমের নিয়ম মানতে হলে ইইউ নির্ধারিত পদ্ধতিতে কারখানার ‘স্কোপ-১’ ও ‘স্কোপ-২’ পর্যায়ের কার্বন নিঃসরণের সুনির্দিষ্ট ও যাচাইকৃত তথ্য প্রয়োজন। তাই ‘সবুজ কারখানার সনদ থাকা’ আর ‘সিবিএএমের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকা’—এই দুইয়ের মধ্যে বাস্তব অর্থে বড় ধরনের একটি ফারাক রয়ে গেছে, যা এখন কাঠামোগতভাবেই দূর করা প্রয়োজন।
জরুরি করণীয়
এই বাস্তবতায় দেশের পোশাক সরবরাহকারী ও উৎপাদকদের সামনে এখন বেশ কিছু জরুরি করণীয় রয়েছে। প্রথমত, ইইউর নিয়ম মেনে কার্বন নিঃসরণ পরিমাপ ও হিসাব করার জন্য কারখানার নিজস্ব বা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, কার্বন নিঃসরণের তথ্য যাচাইয়ের জন্য স্বীকৃত তৃতীয় পক্ষের (থার্ড পার্টি ভেরিফায়ার) সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। তৃতীয়ত, ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে যাচাইকৃত এসব তথ্য সহজে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা কারখানাকে সিবিএএম রেজিস্ট্রিতে স্বেচ্ছায় নিবন্ধন করতে হবে। সর্বোপরি, দীর্ঘ মেয়াদে সনদের খরচ কমাতে কম কার্বন নিঃসরণ হয়—এমন উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর কোনোটিই এখন আর হালকাভাবে নেওয়ার বা ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার সুযোগ নেই।
ঝুঁকি কমাতে করণীয়
সিবিএএম নীতিমালার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি এলডিসি উত্তরণ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স ডিরেক্টিভ’-এর আওতায় সরবরাহব্যবস্থার শর্তাবলি কঠোর হওয়া এবং ক্রেতা পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্রমবর্ধমান লক্ষ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এসব বহুমুখী পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের সামনে প্রস্তুতির সময় বা সুযোগ বেশ সীমিত। তাই দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কারখানা পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ পরিমাপের সক্ষমতা অর্জন এবং ইইউর বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে জোরালোভাবে যুক্ত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত এসব পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বাজারে প্রতিযোগীর কাছে আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে। বাস্তবতা ও তথ্য-উপাত্ত একেবারে স্পষ্ট, আর সময়সীমাও নির্দিষ্ট। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ধেয়ে আসা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার গতির সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিগত পদক্ষেপ কতটা তাল মেলাতে পারবে।
লেখক: বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক।



