এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমি বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের আশঙ্কা
এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমি বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ

এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমি বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের আশঙ্কা

প্রশান্ত মহাসাগরের অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে এ বছর বাংলাদেশে তুলনামূলক শুষ্ক মৌসুমি বৃষ্টি এবং একাধিক তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশি আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। ‘এল নিনো’ নামে পরিচিত এই প্রাকৃতিক ঘটনার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার এই প্রবণতাই এল নিনোর মূল কারণ, যা বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শীর্ষ আবহাওয়া সংস্থাগুলো তাদের পৃথক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এতে স্পষ্ট যে, একটি এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যা সেপ্টেম্বর নাগাদ চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে এই অঞ্চলের মেঘমালা প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যভাগের দিকে সরে যায়। ফলে বাংলাদেশ মৌসুমি বৃষ্টির স্বাভাবিক শীতল প্রভাব থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং উচ্চচাপের প্রভাবে সরাসরি সূর্যের তাপ ভূমিতে বেশি পড়বে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মারুফুর রহমান বলেন, “এল নিনোর কারণে সমুদ্র থেকে স্বাভাবিক আর্দ্রতার প্রবাহ ব্যাহত হয়।” তিনি আরও বলেন, “এর ফলে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে, দীর্ঘ শুষ্ক সময় বা খরাও দেখা দিতে পারে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. রবিউল আউয়াল বলেন, “মনসুনের আগে যদি এল নিনো তৈরি হয়, তাহলে এই অঞ্চলের মৌসুমি বৃষ্টি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে।” তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “দুর্বল মানে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হবে, যার প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়বে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত বছরের অভিজ্ঞতা

২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় বাংলাদেশ তীব্র তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সে সময় দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫১টিতে ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। এই ঘটনা এল নিনোর প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস

বৈশ্বিক পূর্বাভাসবিশ্বখ্যাত আবহাওয়া সংস্থা যুক্তরাজ্যের মেট অফিস জানিয়েছে, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে এবং এল নিনোর স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মেট অফিসের জলবায়ুবিষয়ক যোগাযোগ কর্মকর্তা গ্রাহাম ম্যাজ বলেন, “সুপার এল নিনো বলে কোনও আনুষ্ঠানিক পরিভাষা নেই। তবে এটি একটি বড় ধরনের ঘটনা হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি চলতি শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে, যা ১৯৯৮ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনার সঙ্গে তুলনীয়।”

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া)-এর অধীন ন্যাশনাল সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল প্রেডিকশন জানিয়েছে, এল নিনো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ এবং এটি অন্তত ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

গবেষণা ও ইতিহাস

২০২০ সালে স্প্রিংগার নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এল নিনো-দক্ষিণী দোলন (এনসো) বাংলাদেশের বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে এবং মৌসুমি বৃষ্টির সঙ্গে এর সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

‘এল নিনো’ শব্দটির উৎপত্তি ১৬০০-এর দশকে। পেরুর জেলেরা বড়দিনের সময় সমুদ্রের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা লক্ষ্য করে এই নাম দেন, যার অর্থ ‘খ্রিস্ট শিশু’। এটি এল নিনো–দক্ষিণী দোলন (এনসো) নামের একটি প্রাকৃতিক চক্রের অংশ। সাধারণ সময়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বায়ুপ্রবাহ উষ্ণ পানি এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে ঠান্ডা পানি উঠে আসে। এল নিনোর সময় এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে বা দিক পরিবর্তন করে। ফলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে সরে যায় এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।

বৈশ্বিক প্রভাব

এল নিনোর কারণে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় তাপমাত্রা বাড়া, খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ইউরোপে আবহাওয়ার ধরণ বদলে দক্ষিণ ইউরোপে বৃষ্টি বাড়লেও উত্তর ইউরোপে শীত বেশি শুষ্ক হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে পূর্বাঞ্চলে শুষ্কতা দেখা দিতে পারে, অপরদিকে দক্ষিণাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা থাকে। চীনের ইয়াংজি নদী অববাহিকায় বন্যা, ভারতে মৌসুমি বৃষ্টি কমে যাওয়া, পূর্ব আফ্রিকায় অতিবৃষ্টি—এসবও এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব।

এদিকে, অ্যামাজন বনাঞ্চলে শুষ্কতা বাড়ায় গাছপালার বৃদ্ধি কমে যেতে পারে, যা কার্বন শোষণ কমিয়ে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো শুধু একটি আবহাওয়ার ঘটনা নয়—এটি বৈশ্বিক জলবায়ু, কৃষি ও পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই হতে পারে ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।