ট্রাম্পের ন্যাটো ত্যাগের হুমকি: ইউরোপে উত্তেজনা ও সামরিক মহড়া
পোল্যান্ডের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ন্যাটো সেনাদের সঙ্গে পোলিশ বাহিনীর ‘আয়রন ডিফেন্ডার’ সামরিক মহড়া চলছে। মহড়াকালে একটি বিস্ফোরণের পর পোলিশ আব্রামস ট্যাংকের পাশ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। এই মহড়া চলাকালেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর সদস্যপদ ত্যাগের হুমকি দিচ্ছেন, যা ইউরোপে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও ন্যাটোর ভবিষ্যৎ
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের কাছে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সদস্যপদ পুনর্বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, ‘ওহ হ্যাঁ, আমি বলব, বিষয়টি পুনর্বিবেচনার ঊর্ধ্বে।’ ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনে ইউরোপের মিত্রদেশগুলো অংশ না নেওয়ায় ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি এই সহযোগিতা বিনা দ্বিধায় আসা উচিত ছিল।’ ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক কথাবার্তা আবারও বুঝিয়ে দিল, ৩২ সদস্যের এই জোটের কাজের ধরন নিয়ে তাঁর স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।
ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো এক সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়। তবে এই নীতি কার্যকরের জন্য সব সদস্যের ঐকমত্য প্রয়োজন। ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর এই নীতি একবারই কার্যকর করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের চুক্তিতে কেবল ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মিত্রদেশগুলোর প্রতিক্রিয়া ও ট্রাম্প প্রশাসনের অস্পষ্টতা
ট্রাম্প প্রশাসনের অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী বার্তার কারণে মিত্রদেশগুলো এখনো যুদ্ধের লক্ষ্য বুঝে উঠতে পারছে না। এমনকি এই লড়াইয়ের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শও করা হয়নি। ফলে একের পর এক মিত্রদেশ এই যুদ্ধে জড়ানো থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য শুরুতে মার্কিন যুদ্ধবিমান চলাচলের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে সুর বদলায়। তারা জানায়, ‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের’ জন্য এসব ঘাঁটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এই বিলম্ব নিয়ে ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ব্যঙ্গ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইউক্রেন প্রসঙ্গ ও ট্রাম্পের অতীত সমালোচনা
ট্রাম্প ইউক্রেন প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, ‘ইউক্রেনসহ অন্য সব ক্ষেত্রেই আমরা নিজ থেকে পাশে দাঁড়িয়েছি।’ ২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আগেই ট্রাম্প ন্যাটোর কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। তিনি বারবার এই জোটকে ‘কাগুজে বাঘ’ ও ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে অভিহিত করেন। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে এই জোট ছেড়ে প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিলেন। ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ তাঁর সাম্প্রতিক স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমরা স্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, ট্রাম্প তাঁর হুমকি কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’
সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি ও রুটের ভূমিকা
ট্রাম্পের আপত্তির মূল কারণ ছিল ২০১৪ সালের একটি চুক্তি, যেখানে সদস্যদেশগুলোর জিডিপির ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছিল। ন্যাটোর প্রায় সব সদস্যদেশ এখন তাদের সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর পেছনে একদিকে ট্রাম্পের হুমকি, অন্যদিকে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি কাজ করেছে। ন্যাটোর বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুতে ‘ট্রাম্প হুইস্পারার’ হিসেবে পরিচিত। তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে বাগে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও আইনি বাধা
ন্যাটোর মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৬২ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট থেকে। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি মনে করি এতে কোনো সন্দেহ নেই, এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমাদের এই সম্পর্ক (ন্যাটোর সঙ্গে) পর্যালোচনা করতে হবে।’ তবে ২০২৩ সালের শেষে মার্কিন কংগ্রেস এক ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে ন্যাটো থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এখন এই জোট ছাড়তে হলে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন বা কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই নতুন সংকট ইউরোপীয় দেশগুলো ও কানাডাকে নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার এবং নিজেদের নিরাপত্তায় নিজেদের ওপর নির্ভরশীল হতে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করবে। গত মঙ্গলবার ইতালি তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন যুদ্ধবিমান অবতরণের অনুমতি দেয়নি। ন্যাটোর সদস্যভুক্ত আরেক দেশ স্পেনও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে থাকা মার্কিন বিমানের জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান হুমকির পাশাপাশি হোয়াইট হাউস থেকেও চাপের মুখে রয়েছে ন্যাটো। তবে ৭৭ বছরের পুরোনো এই সামরিক জোটকে টিকিয়ে রাখাই এখন রুতের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।



