রোহিঙ্গাদের ঈদ: কাঁটাতারের আড়ালে হারানো আজ্জু ও প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা
রোহিঙ্গাদের ঈদ: কাঁটাতারে হারানো আজ্জু ও অনিশ্চয়তা

রোহিঙ্গাদের ঈদ: কাঁটাতারের আড়ালে হারানো আজ্জু ও প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা

কক্সবাজারের টেকনাফের জাদিমুরা ও লেদা আশ্রয়শিবিরে কাঁটাতারে ঘেরা জীবনযাপন করছে রোহিঙ্গারা। ঈদুল ফিতরের আনন্দও তাদের জন্য ম্লান হয়ে আছে, কারণ দেশে ফেরার আশা বা 'আজ্জু' এখনো পূরণ হয়নি। রোহিঙ্গা ভাষায় 'আজ্জু' শব্দটি মনের ইচ্ছা বা আশাকে বোঝায়, যা এই ১৪ লাখ শরণার্থীর কাছে মানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়া।

ঈদের আনন্দহীন দিনগুলো

লেদা আশ্রয়শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, 'নিজ দেশে না থাকলে ঈদের আনন্দই তো থাকে না। আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ, মেহমান হিসেবে থাকছি, কিন্তু মেহমান হয়ে থাকতে কারই ভালো লাগে? কষ্টে থাকলেও নিজ দেশে নিজ বাড়ির অনুভূতি আলাদা।' জাদিমুরা শিবিরের রোহিঙ্গা আবদুল নবী ও রফিক উল্লাহ হেসে ওঠেন যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, বিগত সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এবারের ঈদ রাখাইনে কাটানোর কথা ছিল কিনা। রফিক উল্লাহ যোগ করেন, 'এই ত্রিপলের ছাউনিতে আটটা ঈদ কেটেছে, কিন্তু কোনো ঈদ আরাকানের মতো উৎসবমুখর হয়নি। কবর জিয়ারতের সুযোগও নেই এখানে।'

মানবিক সংকট ও খাদ্যসহায়তা হ্রাস

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের সতর্ক করে দেন, আশ্রয়শিবিরগুলোতে মানবিক সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আগে মাথাপিছু ১৪ ডলার খাদ্যসহায়তা দেওয়া হতো, যা এখন ১২ ডলারে নেমে এসেছে এবং আগামী এপ্রিল থেকে আরও কমার খবর রয়েছে। গোলজার বেগম, যিনি ২০১৭ সালে তিন সন্তান নিয়ে পালিয়ে এসেছেন, বলেন এবারের ঈদে গরুর মাংস ও চালের রুটি পরিবেশন করা সম্ভব হয়নি অর্থসংকটের কারণে। শিশুদের নাগরদোলা থাকলেও বড়দের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা

মধুরছড়া শিবিরের সালামত উল্লাহ ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশাহারা। তিনি বলেন, খাদ্যসহায়তা এক মাস চলে না, আর ক্যাম্পের বাইরে কাজ করে দৈনিক ৩০০-৫০০ টাকা আয়ও এখন কড়াকড়ির কারণে বন্ধ। শিশুদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে তহবিল সংকটে, এবং রাখাইনে ফিরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা নেতা জালাল আহমদ উল্লেখ করেন, রাখাইন রাজ্য এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, যা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।

প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা নিবন্ধিত, যাদের মধ্যে ২০১৭ সালের পর আট লাখ নতুন করে এসেছে। এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার নেতা মোহাম্মদ রফিক বিএনপি সরকারের প্রতি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, অতীতে বিএনপি সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠিয়েছিল বলে। তবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসনে আপাতত দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, কিন্তু সরকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে নতুন অনুপ্রবেশ রোধে।

রোহিঙ্গাদের জন্য ঈদ এখন শুধুই একটি স্মৃতি, যেখানে 'আজ্জু' বা ফেরার আশা দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে কাঁটাতারের আড়ালে।