তুরস্কে আর্মেনীয় জেনোসাইড: অস্বীকারের রাজনীতি ও লুণ্ঠনের ইতিহাস
তুরস্কে আর্মেনীয় জেনোসাইড: অস্বীকার ও লুণ্ঠন

তুরস্কে আর্মেনীয় জেনোসাইড: অস্বীকারের রাজনীতি ও লুণ্ঠনের ইতিহাস

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার একটি নিষ্ঠুর উক্তি করেছিলেন। পোল্যান্ড আক্রমণের নির্দেশ দিতে গিয়ে তিনি ১৯১৫ সালের আর্মেনীয় জেনোসাইডের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আজ আর্মেনীয়দের নিশ্চিহ্ন হওয়ার কথা কে আর মনে রেখেছে?’ জেনোসাইড গবেষকরা উল্লেখ করেন যে যেকোনো গণহত্যার সর্বশেষ ও দীর্ঘস্থায়ী ধাপ হলো একে ‘অস্বীকার’ করা। হিটলারের এই উক্তি ইতিহাসে একটি প্রমাণ, কীভাবে বিচারহীনতা নতুন স্বৈরশাসকদের উৎসাহিত করে।

জেনোসাইডের পটভূমি ও পরিকল্পনা

আর্মেনীয় জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে, বিশেষ করে ‘ইয়াং টার্কস’ বা তরুণ তুর্কি সরকারের অধীনে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই গণহত্যা চালানো হয়। এই আট বছরে অটোমান সাম্রাজ্যের মানচিত্র থেকে ৩০ লক্ষের বেশি খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয় বা সিরীয় মরুভূমিতে নির্বাসিত করা হয়। এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আর্মেনীয়রা, পাশাপাশি আসিরীয় ও গ্রিক সম্প্রদায়ের মানুষও নৃশংসতার শিকার হন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অটোমান রাষ্ট্র জনসংখ্যার তথ্য সংগ্রহ করেছিল, যা পরে সংখ্যালঘু নিধনে কাজে লাগে।

ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণা

আর্মেনীয় জেনোসাইড নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর মধ্যে রয়েছে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি মরগেনথাউয়ের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ ‘অ্যাম্বাসেডর মরগেনথাউস স্টোরি’, যেখানে অটোমান সরকারের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ রয়েছে। তুর্কি ইতিহাসবিদ তানের আকচামের ‘আ শেইমফুল অ্যাক্ট’ বইটি অটোমান আর্কাইভ ঘেঁটে গণহত্যার রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে। পিটার বালাকিয়ানের ‘দ্য বার্নিং টাইগ্রিস’ এবং ফ্রাঞ্জ ভেরফেলের ‘দ্য ফোরটি ডেজ অব মুসা দাগ’ উপন্যাসও এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও সম্পত্তি দখল

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত উমিত কুর্তের ‘দ্য আর্মেনিয়ানস অব আইনতাব’ বইয়ে দেখা যায়, আর্মেনীয় গণহত্যার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। লেখক প্রমাণ করেন যে আর্মেনীয়দের বাড়িঘর, দোকানপাট ও সম্পত্তি দখল করাই ছিল এই গণহত্যার একটি মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় মানুষ ও নেতারা লুণ্ঠনে অংশ নিয়েছিলেন, এবং সরকার ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন’ এর মাধ্যমে এই লুটপাটকে বৈধতা দিয়েছিল। এই লুট করা সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই তুরস্কে নতুন ধনী গোষ্ঠীর জন্ম হয়।

অস্বীকারের প্রক্রিয়া ও মিথ্যা প্রচারণা

জেনোসাইড অস্বীকার করার প্রক্রিয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। ১৯১৬ সালে অটোমান সরকার ‘Ermeni Komitelerinin Amaal ve Harekat-htilaliyesi’ নামক একটি প্রোপাগান্ডা বই প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয় যে আর্মেনীয়রাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। আরাম দিলদিলিয়ান নামক একজন আর্মেনীয় ফটোগ্রাফারকে জোরপূর্বক সাজানো অস্ত্রের ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা রাষ্ট্রীয় মিথ্যার একটি উদাহরণ।

নারী নির্যাতন ও ধর্মান্তর

আর্মেনীয় গণহত্যার একটি ভয়াবহ দিক ছিল নারীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন। পুরুষদের হত্যার পর নারী ও শিশুদের সিরিয়ার মরুভূমির দিকে তাড়িয়ে নেওয়া হয়, যেখানে তারা ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হন। অনেক নারীকে দাসিদের বাজারে বিক্রি বা জোর করে ধর্মান্তরিত করে তুর্কি বা কুর্দি পরিবারে রাখা হয়। তাদের খ্রিষ্টান নাম পাল্টে ফেলা হয় এবং মাতৃভাষা বলা নিষিদ্ধ করা হয়, যা একটি জাতির মনোবল ভাঙার কৌশল ছিল।

আধুনিক তুরস্কের অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া

অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি হিসেবে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র কখনোই আর্মেনীয় হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকার করেনি। সরকারি ভাষ্যমতে, এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটি ‘যুদ্ধকালীন ট্র্যাজেডি’। তুরস্ক সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লবিং চালায় যেন অন্য দেশগুলো একে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়। নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক ওরহান পামুক এবং সাংবাদিক হ্রান্ট ডিঙ্কের মতো ব্যক্তিরা এই বিষয়ে কথা বলায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক রোষানলের শিকার হন।

ক্ষমা চাওয়ার প্রচারণা ও সমালোচনা

২০০৮ সালে তুরস্কে ‘আমি ক্ষমা চাইছি’ নামে একটি প্রচারণা শুরু হয়, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার তুর্কি নাগরিক আর্মেনীয়দের জন্য ক্ষমা চান। তবে লেখকরা এর সমালোচনা করে বলেন, আর্মেনীয়দের সম্পত্তি ফেরত না দিয়ে কেবল ক্ষমা চাওয়া একধরনের আধিপত্যবাদী আচরণ। কুর্দি বুদ্ধিজীবী ফিরাত আইদিনকায়া স্বীকার করেন যে স্থানীয় কুর্দিরা লুণ্ঠনের জন্য জেনোসাইডে অংশ নিয়েছিলেন।

উপসংহার: অস্বীকারের রাজনীতির প্রভাব

একুশ শতকে আর্মেনীয় জেনোসাইড অস্বীকারের রাজনীতি কেবল অতীতকে আড়াল করার চেষ্টা নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, একাডেমিক বিকৃতি ও ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। বিচারহীনতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম অবিচারকে স্থায়ী করে, এবং সত্যের মুখোমুখি না হয়ে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। এই ইতিহাস আমাদের শেখায় যে লুণ্ঠিত সম্পদের স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো জাতির অগ্রগতি সম্ভব নয়।