নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা 'আর বিদ্যমান নেই', ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রে গভীর বিভাজনের সতর্কবার্তা
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা 'আর বিদ্যমান নেই' এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে 'গভীর বিভাজন' সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বার্ষিক মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। মের্ৎস জোর দিয়ে বলেন, বড় শক্তিগুলোর প্রাধান্য বিস্তারের এই সময়ে 'আমাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত নয়' এবং ইউরোপীয়দের 'ত্যাগ স্বীকারে' প্রস্তুত থাকতে হবে।
সম্মেলনের প্রেক্ষাপট ও মার্কিন নীতির প্রভাব
এই সম্মেলনটি এমন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছেন। এ ছাড়া তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন, যা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্মেলনে মের্ৎসের ভাষণ শুনছিলেন এবং তিনি নিজেও ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। রুবিও আগেই 'ভূরাজনীতিতে এক নতুন যুগ'-এর কথা উল্লেখ করেছেন, যা বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতাকে প্রতিফলিত করে।
মের্ৎসের সতর্কবার্তা ও ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া
নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে—এমন একাধিক সতর্কবার্তা দিয়ে মের্ৎস বলেন, 'আমার মনে হয়, আমাদের আরও স্পষ্টভাবে বলতে হবে—এই ব্যবস্থা, যতটা অসম্পূর্ণই হোক না কেন, সর্বোত্তম অবস্থাতেও, সেই রূপে আর বিদ্যমান নেই।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিভাজন, একটি গভীর ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক বছর আগে মিউনিখে এটি খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন।' মের্ৎস উল্লেখ করেন, 'তিনি ঠিক ছিলেন। মাগা (Make America Great Again) আন্দোলনের সাংস্কৃতিক যুদ্ধ আমাদের নয়।' তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'যখন কোনো বক্তব্য মানবমর্যাদা ও সংবিধানের বিরুদ্ধে যায়, তখন আমাদের কাছে বাক্স্বাধীনতার সীমা সেখানেই শেষ। আমরা শুল্ক ও সংরক্ষণবাদের প্রতি বিশ্বাস করি না, বরং মুক্ত বাণিজ্যের প্রতি বিশ্বাসী।'
ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ উদ্যোগ
গত বছর জেডি ভ্যান্স ইউরোপের, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের, বাক্স্বাধীনতা ও অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেছিলেন। তার সেই বক্তৃতা ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের মধ্যে অভূতপূর্ব উত্তেজনার একটি বছর সূচনা করেছিল। তবে মের্ৎস দশকব্যাপী অংশীদারত্বকে উপেক্ষা করেননি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'চলুন, ট্রান্সআটলান্টিক বিশ্বাস মেরামত ও পুনর্জীবিত করি।' জার্মানির এই নেতা আরও জানান, তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ-র সঙ্গে যৌথ ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে 'গোপন আলোচনা' চালাচ্ছেন, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। ইউরোপে শুধু ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য-ই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, তবে জার্মানি এবং অন্যান্য অনেক ইউরোপীয় দেশ ঐতিহ্যগতভাবে ন্যাটোর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সুরক্ষা বলয়ের ওপর নির্ভরশীল।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের অবস্থান ও সম্মেলনের গুরুত্ব
শুক্রবার পরে সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আবারও জোর দিয়ে বলেন, নতুন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপকে 'ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তৈরি হতে শিখতে হবে'। চলতি বছরের সম্মেলনে প্রায় ৫০ জন বিশ্বনেতার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে ইউরোপের প্রতিরক্ষা এবং ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনা হবে। এই আলোচনাগুলো বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তনের মুখোমুখি হচ্ছে।
