কায়রোতে পরিবার সুরক্ষায় বৈশ্বিক সম্মেলন: ১৮ দফা সুপারিশ ঘোষণা
মিশরের রাজধানী কায়রোতে পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদারে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংলাপের সূচনা হয়েছে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া ও আইন অনুষদের উদ্যোগে ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে আধুনিক বিশ্বের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবার সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনের বিস্তারিত বিবরণ
‘একটি সুসংহত সমাজ গঠন, আধুনিক চ্যালেঞ্জে পরিবারকে রক্ষা’ শীর্ষক এই সম্মেলনটি ১৮ ও ১৯ এপ্রিল নাসর সিটির আল-আজহার কনফারেন্স হলে আয়োজিত হয়। ড. আহমদ আত-তায়্যেবের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত এই আয়োজনটির গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উদ্বোধনী অধিবেশনে মিশরের ওয়াকফ ও ধর্মমন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারিসহ বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা আলেম, আইনবিদ ও গবেষকরা অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ উপস্থিত ছিলেন, যিনি সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ তার বক্তব্যে পরিবারকে সমাজের মূলভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, “বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় অপরিহার্য।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোর গুরুত্ব জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবনায় স্বীকৃত হয়েছে এবং বাংলাদেশসহ অনেক দেশ এই বিষয়ে একই অবস্থান বজায় রেখেছে।
সম্মেলনের পূর্বে রাষ্ট্রদূত মিশরের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও একাডেমিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এই বৈঠকে তিনি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বৃদ্ধি ও শিক্ষা-সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ও আলোচনার বিষয়বস্তু
এই সম্মেলনে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাহরাইন ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতরাও অংশগ্রহণ করেন, যা এটিকে একটি সত্যিকারের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে। সম্মেলনের সভাপতি অধ্যাপক ড. আতা আবদুল আতি আস-সানবাতি উল্লেখ করেন যে, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রভাবের কারণে পরিবার আজ বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি।
সম্মেলনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা পরিবার রক্ষার কৌশল নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ধর্মমন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারি পরিবারকে একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করে সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আলেম ও দাওয়াহকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভূমিকা
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এই সম্মেলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ইসলামিক ল’ বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব আল হাসান বলেন, “আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত এবং অর্জিত জ্ঞান দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।” অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিকে তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
সম্মেলনের ফলাফল ও সুপারিশ
দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে মোট ছয়টি বৈজ্ঞানিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকরা তাদের গবেষণা উপস্থাপন করেন। সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের আইন সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, যা একাডেমিক ও আইনগত সমন্বয় জোরদারে ভূমিকা রাখবে।
সমাপনী অধিবেশনে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ সাদিক ১৮ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেন। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পারিবারিক আইন সংস্কার
- বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি
- বিয়ের পূর্ব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম
- শিক্ষা ব্যবস্থায় পারিবারিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্তি
- ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
- প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা
ইসলামি শরিয়া ও আইন অনুষদের শিক্ষাসচিব ও তথ্যকেন্দ্রের প্রধান প্রফেসর ড. আবদুর রহমান আশরাফ জানান, ধারাবাহিকভাবে ষষ্ঠবারের মতো এই আন্তর্জাতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য পরিবারভিত্তিক সামাজিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা।
১৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় ১৮ দফা সুপারিশ ঘোষণার মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন সমাপ্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে এই সম্মেলন একটি কার্যকর বৈশ্বিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।



