পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বাংলাদেশ ইস্যুর ভূমিকা ও বিজেপির কৌশল
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বাংলাদেশ ইস্যু ও বিজেপির সাফল্য

সদ্য শেষ হওয়া পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুধু ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজেপির সরকার গঠনের কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে না। এই নির্বাচন এমন এক সময় হিসেবেও চিহ্নিত হবে, যখন দীর্ঘদিনের সীমান্ত ইস্যু নতুন করে নির্বাচনি গুরুত্ব পায় এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশও রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে।

নির্বাচনি ফলাফল ও প্রেক্ষাপট

ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ফলে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন, আর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি। ফালতা আসনের ফল এখনও ঘোষণা হয়নি, সেখানে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিজেপির এই ভূমিধস জয়ের পেছনে একক কোনও কারণ ছিল না। বরং একাধিক বিষয় এখানে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং নারীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশ ইস্যুর ভূমিকা

অপরদিকে, বিজেপির ছিল শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো। আর এই বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলোকে আদর্শিক ভিত্তি দিয়েছে বাংলাদেশ ইস্যু। এটি জনঅসন্তোষকে সভ্যতাগত নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ দিয়েছে।

ভোটের মাঠে বাংলাদেশ এমন এক আয়নায় পরিণত হয়েছিল, যেখানে পশ্চিমবঙ্গকে নিজের অবস্থান নিজেকেই খুঁজে নিতে বলা হচ্ছিল—হিন্দু না মুসলিম, শরণার্থী না অনুপ্রবেশকারী, সীমান্তাঞ্চল না জাতিরাষ্ট্র, বাঙালি না রাষ্ট্রবিরোধী। এটিই ছিল বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। তারা বাংলাদেশকে এমন এক রাজনৈতিক ব্যাকরণে পরিণত করে, যার মাধ্যমে নাগরিকত্ব, জনসংখ্যা, কল্যাণনীতি ও আনুগত্যের প্রশ্নগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি

এটি সম্ভব হয়েছিল, কারণ ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তখন বৈধতা, সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা সংকটের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দায়িত্ব নেয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুদের দোকান, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। চলতি বছরও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর চাপ ও গণপিটুনির ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবে বাংলাদেশ সংক্রান্ত ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়া প্রতিটি তথ্য সঠিক ছিল কিনা, নির্বাচনি দৃষ্টিকোণ থেকে তা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি; বরং গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই রাজনৈতিক ধারণা, যা এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল। অনেক হিন্দু ভোটারের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, পূর্ব সীমান্ত একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল।

বিজেপির তিনটি প্রতিশ্রুতি

বিজেপির প্রচারণা এই নিরাপত্তাহীনতাকে তিনটি পরস্পর-সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতিতে রূপ দিয়েছে।

প্রথমত, দলটি নিজেকে বাংলাদেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসা হিন্দু শরণার্থীদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে, বিশেষ করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ঘিরে। এই আইন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা অমুসলিম শরণার্থীদের দ্রুত ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের মার্চে এই আইনের বিধিমালা জারি করা হয় এবং একই বছরের মে মাসে প্রথম নাগরিকত্ব সনদ দেওয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, বিজেপি অবৈধ অভিবাসনকে তৃণমূলের কথিত ভোটব্যাংক রাজনীতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে, এবং এটি মুসলমানদের পক্ষে কাজ করেছে বলেও প্রচার চালিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় থাকা দলটি।

তৃতীয়ত, এই দুই ইস্যুকেই তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল—শুধু বিজেপি সরকারই সীমান্ত নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কলকাতাকে দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবে।

দ্বৈত বার্তার কৌশল

এই কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একইসঙ্গে বিপজ্জনক দিক ছিল এর দ্বৈত বার্তা। বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু অভিবাসীদের কাছে এটি স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তৈরি করেছে সন্দেহ।

এই দ্বৈত রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল মতুয়া প্রশ্ন। অবিভক্ত পূর্ববঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে আসা দলিত শরণার্থীদের একটি সম্প্রদায় মতুয়ারা কেবল জাতিগত ভোটব্যাংক নয়; তারা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের জটিল বাস্তবতার প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে তারা জাতিগত বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চিত নাগরিকত্ব, নথিপত্রের অনিশ্চয়তা এবং কল্যাণসেবা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতিতে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে।

নির্বাচনি প্রচারে তৃণমূল কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মতুয়াদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছে। অপরদিকে, বিজেপি তাদের সামনে আরও গভীর এক প্রতিশ্রুতি হাজির করে; নাগরিকত্বকে অতীতের ঐতিহাসিক অবিচারের সংশোধন হিসেবে তুলে ধরে দলটি।

ভোটার তালিকা বিতর্ক

এ কারণেই ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ ছিল না; বিজেপি এটিকে কে এই দেশের প্রকৃত নাগরিক—তার এক ধরনের গণভোট হিসেবে উপস্থাপন করে।

প্রায় ২৭ লাখ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। সমালোচকদের মতে, এই সংশোধন প্রক্রিয়া বিশেষভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। তবে বিজেপি একে গণতান্ত্রিক পরিশুদ্ধি হিসেবে তুলে ধরে।

এখানে বাংলাদেশ ইস্যু শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি কাঠামোগত রূপ নেয়। সীমান্ত যেন আবার হাজির হয় ভোটকেন্দ্রে, ভোটার তালিকায় এবং নাগরিকত্ব প্রমাণে নথিপত্র হাতে উদ্বিগ্ন মানুষের দীর্ঘ সারিতে।

তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া

পশ্চিমবঙ্গে লাখ লাখ অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী থাকার অভিযোগের জবাবে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিরাপত্তা কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। তিনি বিজেপির বক্তব্যকে সাম্প্রদায়িক বলেও আখ্যা দেন।

তবে এসব যুক্তি ছিল আত্মরক্ষামূলক। অভিযোগের জবাব দিলেও তা মানুষের ভীতি দূর করতে পারেনি।

তৃণমূলের ব্যতিক্রমবাদের অবসান

১৫ বছর ধরে তৃণমূল কল্যাণমূলক জনতুষ্টিবাদ এবং বাঙালি ব্যতিক্রমবাদের সমন্বয়ে রাজনীতি করেছে—যে ধারণা অনুযায়ী বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদকে প্রতিহত করবে। ২০২৬ সালের রায় বলছে, সেই ব্যতিক্রমবাদ আর কার্যকর নেই। বিজেপি এখন বাংলাতেও হিন্দুত্বের ভাষা বলতে শিখেছে।

বাংলাদেশ ইস্যু বিজেপিকে চাকরি, অপরাধ, দুর্নীতি ও কল্যাণসেবার অপব্যবহার নিয়ে স্থানীয় উদ্বেগকে বৃহত্তর জাতীয় ক্ষোভের বয়ানের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দিয়েছে। এর ফলে হিন্দু ঐক্যবদ্ধতাকে সংখ্যাগুরুবাদী আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার রূপে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।

এতে তৃণমূল এমন এক কঠিন অবস্থানে পড়ে, যেখানে মুসলিম নাগরিকদের পক্ষে কথা বললে তাদের অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থক হিসেবে চিত্রিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার পূর্ব পাকিস্তান ও দেশভাগের পর বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থী-অভিবাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে ভোটার তৈরির অভিযোগ ওঠে।

উপসংহার

সবমিলিয়ে, বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ইসলামপন্থি তৎপরতা এবং ভারতবিরোধী বক্তব্যকে নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একইসঙ্গে এসবকে ভারতীয় মুসলমানদের কোনও বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরার অজুহাত হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়।

ভাষা, দেশভাগ, অভিবাসন, নদী, শ্রম, আত্মীয়তা, স্মৃতি ও বেদনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সবসময়ই বাংলার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু এবারের নির্বাচনে যে বিষয়টি বদলে গেছে, তা হলো এর রাজনৈতিক রূপ। সীমান্তকে নির্বাচনি অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। বিজেপির জয় এসেছে এই উপলব্ধি থেকে যে, ইতিহাস সবসময় অতীতে আটকে থাকে না; ভোটকেন্দ্রে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য তাকে আবারও হাজির করা যায়।

লেখক: সুইডেনের লিনিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ও জ্যেষ্ঠ প্রভাষক।