টানা ভারি বর্ষণে রাঙামাটি জেলায় শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।
পাহাড়ধস ও বন্যার বিস্তারিত
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিলাইছড়িতে ৩৭টি, কাউখালীতে ৩০টি, কাপ্তাইয়ে ১৫টি, রাঙামাটি সদরে ১৩টি, বাঘাইছড়িতে ৩টি এবং নানিয়ারচরে ২টিসহ এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঘাইছড়ি উপজেলা। সেখানে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, যাতে প্রায় ৫ হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও ফসলি জমির ক্ষতি
পাহাড়ধস ও নিম্নাঞ্চল ডুবে যাওয়ায় জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কাপ্তাই হ্রদে প্রবল পানি প্রবাহ থাকায় নৌযান চলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি এবং রাঙামাটি-কাপ্তাই-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা-বাঙালহালিয়া সড়কে পাহাড়ধসে যানবাহন চলাচল বন্ধ হওয়ার ১১ ঘণ্টা পর স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানান রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম
পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে স্থানীয়দের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাঘাইছড়ি উপজেলায় দুর্গতদের জন্য ৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ২৪৮ জন আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে জেলায় ৩০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষ অবস্থান নিয়েছেন। আশ্রিত লোকজনদের দিনে তিন বেলা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা করছে জেলা প্রশাসন।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও আবহাওয়া
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাঙামাটিতে ১৪৫টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় এবং ২৯টি অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ৫ হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাঙামাটিতে ১৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় হয়েছিল ২৮৭ মিলিমিটার। বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলেও টানা বর্ষণের কারণে উজান থেকে পাহাড়ি ঢল অব্যাহতভাবে নামছে, ফলে পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত শারমিন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। প্রশাসন সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।



