খুলনার কয়রা উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর কয়রা গ্রামের নদী রক্ষা বেড়িবাঁধের (পানি উন্নয়ন বোর্ডের সড়ক) প্রায় ৮০০ মিটার অংশ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভাঙাচোরা আরসিসি ব্লক, মাটি ধস ও অসংখ্য খানাখন্দে সড়কটি এখন প্রায় চলাচলের অনুপযোগী। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ ব্যবহার করছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, রোগীসহ কয়েক হাজার মানুষ।
দীর্ঘদিনের অবহেলায় সড়কের নাজুক অবস্থা
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির অবস্থা দিন দিন আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় মোটরসাইকেল, ভ্যান, ইজিবাইকসহ ছোট যানবাহনের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় পথচারীরাও হোঁচট খেয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
২০০৯ সালের আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত, এরপর আর সংস্কার হয়নি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে নির্মিত নদী রক্ষা বেড়িবাঁধটি ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’য় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় জরুরি ভিত্তিতে বাঁধটি রক্ষা করা সম্ভব হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সংস্কারকাজ পরিচালনা করে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের দিকে নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় আরসিসি ব্লক বসানো হয়। এরপর আর উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি।
দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বৃষ্টি, জোয়ারের পানি ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে বাঁধের বিভিন্ন অংশে মাটি সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে আরসিসি ব্লকের টপিং উঠে গেছে। আবার কয়েকটি স্থানে ফাঁপা অংশ (ঘোগা) তৈরি হওয়ায় জোয়ারের সময় নদীর পানি বাঁধের ভেতরে প্রবেশ করছে। এতে বাঁধটির স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে বেহাল অবস্থা
সরেজমিনে দেখা যায়, ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাটের দক্ষিণ পাশ থেকে স্লুইসগেট পর্যন্ত প্রায় ৮০০ মিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশ অংশই বেহাল অবস্থায় রয়েছে। কোথাও আরসিসি ব্লকের আবরণ উঠে গেছে, কোথাও আবার মাটি ধসে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য অসাবধানতায়ও যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক গাজী বলেন, “এই সড়ক দিয়েই প্রতিদিন শত শত মানুষ চলাচল করেন। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় যাতায়াত খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
আরেক বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন বলেন, “বাঁধের বিভিন্ন স্থানে মাটি ধসে গেছে এবং ব্লকের আবরণ উঠে গেছে। জোয়ারের সময় কয়েকটি স্থান দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে। দ্রুত সংস্কার না করলে বড় জোয়ারে বাঁধ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, “এটি শুধু একটি সড়ক নয়, পুরো এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ। কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া, রোগী হাসপাতালে পৌঁছানো এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত—সবকিছুই এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বছরের পর বছর এটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।”
ইউপি সদস্যের উদ্বেগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আশ্বাস
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. নাজমুচ্ছায়াদাত বলেন, “বেড়িবাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে সংস্কার করা সম্ভব নয়। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়রা উপবিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. সুলতান মাহমুদ বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা আছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে সড়কটি সংস্কারের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে। অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।”
জরুরি সংস্কারের দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয়দের দাবি, এটি শুধু একটি চলাচলের সড়ক নয়, একই সঙ্গে নদী রক্ষা বেড়িবাঁধ। তাই মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপকূলীয় জনপদকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার করা প্রয়োজন। অন্যথায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বড় জোয়ার বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁধের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।



