ঘরের ভেতরে হাঁটু সমান পানিতে দাঁড়িয়ে আছেন সুভাষ চক্রবর্তী। আজ সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বাদামতল এলাকায় তাঁর বসতঘর হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। আলমারি, সোফা সব ডুবে গেছে। খাটের ওপর চেয়ার তুলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখেছেন। রান্নাঘরের চুলাও পানির নিচে। রান্না করা যাচ্ছে না। কিন্তু না খেয়ে তো থাকা যায় না। তাই চাল-ডাল নিয়ে প্রতিবেশীর ঘরে রান্না করছেন বলে জানান ষাটোর্ধ্ব সুভাষ চক্রবর্তী।
শতাধিক পরিবার পানিবন্দি
অবশ্য শুধু সুভাষ চক্রবর্তী নন। বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের অন্তত তিনটি গ্রামের নিচু এলাকার শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার সড়ক ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
সুভাষ চক্রবর্তীর প্রতিবেশী সন্তোষ চক্রবর্তী বলেন, ‘এত টানা বৃষ্টি গত কয়েক বছরে দেখিনি। সাধারণত এক-দুই ঘণ্টা বৃষ্টি থামলেই পানি নেমে যায়। এবার চার দিন ধরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে অনেক পরিবার জলাবদ্ধতায় গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে।’
অতি ভারী বর্ষণ রেকর্ড
সীতাকুণ্ড আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে আজ বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে গত রোববার রেকর্ড করা হয় ৫৯ মিলিমিটার, সোমবার রেকর্ড করা হয় ১০৩ মিলিমিটার। ২৪ ঘণ্টায় ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলে সেটিকে অতি ভারী বর্ষণ বলা হয়।
বর্ষণের কারণে উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় চলাচলের একটি সড়ক ভেঙে খাদে পড়েছে। ভাটিয়ারী ইউনিয়নের জঙ্গল ভাটিয়ারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে ১২০টি পরিবারের ঘরে পানি ঢুকেছে। প্রবল স্রোতের কারণে নিরাপদ স্থানে যেতে পারেননি এসব পরিবারের সদস্যরা। বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পাহাড়ের চূড়ায় কৃষকদের টংঘরে। গতকাল উপজেলা প্রশাসন তাঁদের জন্য শুকনা খাবার পাঠিয়েছে।
বিভিন্ন এলাকায় পানি, হতাহত নেই
এ ছাড়া উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের লতিফপুর, ভাটিয়ারী ইউনিয়নের রেলস্টেশন এলাকা, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের অন্তত তিনটি গ্রাম, কুমিরা ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম, পৌরসভার সব কটি ওয়ার্ড, বারৈয়ারঢালা, মুরাদপুর ও সৈয়দপুর এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোথাও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রহমত উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গল ভাটিয়ারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় প্রতিবছরই ভারী বর্ষণে তাঁদের দুর্ভোগ হয়। পাহাড়ি ঢল নামলে ঘর ছেড়ে পাহাড়ের উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য একটি বিদ্যালয় খোলা রাখা হয়েছে।
পাহাড়ধসের আশঙ্কায় সতর্কতা
এদিকে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। কুমিরা ইউনিয়নের মগপুকুর এলাকার বাসিন্দা রুবেল নাথ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘরের ভেতর পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ঘরে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই।’
সীতাকুণ্ড আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইমরান প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আরও এক দিন ভারী বৃষ্টি হতে পারে। আগামী শুক্রবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এক-দুই ঘণ্টা বৃষ্টি না হলে অধিকাংশ জায়গার পানি নেমে যাবে। কোথাও স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



