টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৬ নদী ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)।
ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সপ্তাহান্তে দেশের বড় অংশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এফএফডব্লিউসি শুক্রবার সতর্ক করে বলেছে, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে আগামী ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত জেলা কক্সবাজার
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা কক্সবাজার, যেখানে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৪ হাজারের বেশি মানুষ ৬৪০টি সাইক্লোন ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। শুক্রবার চকরিয়া উপজেলার ১০০টিরও বেশি গ্রামে পানি ঢুকে প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। উদ্ধার কাজে যাওয়ার সময় একটি নৌকা ডুবে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামে পানিবন্দী অবস্থা
টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বড় অংশ হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে ডুবে যায়, যার ফলে ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। কিছু এলাকায় পানি কমলেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ডুবে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ঘর ও দোকানে পানি থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
রাঙ্গামাটি ও কাপ্তাই হ্রদের অবস্থা
উজান থেকে নেমে আসা পানিতে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি ৯০.৩১ ফুটে পৌঁছেছে, যা মৌসুমি স্বাভাবিক স্তরের চেয়ে অনেক বেশি। জেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ অবস্থান করছে। তবে উচ্চ পানির কারণে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট চালু করে ১৭৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
সুনামগঞ্জ ও বেনাপোলের বন্যা
সুনামগঞ্জে কুশিয়ারা নদী বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা নিম্নাঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বেনাপোল স্থলবন্দরে বন্যায় কোটি টাকার আমদানি পণ্য নষ্ট হয়েছে এবং কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
গাইবান্ধা ও বগুড়ায় নদীভাঙন
গাইবান্ধা ও বগুড়ায় নদীভাঙন ত্বরান্বিত হয়েছে, যার ফলে ফসলি জমি, বাড়িঘর ও ফসল ভেসে গেছে এবং ডজন ডজন পরিবার স্থানান্তরিত হয়েছে।
বিপৎসীমার ওপর ৬ নদী
এফএফডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও খোয়াই নদী এক বা একাধিক পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানে বৃষ্টি বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড
বিএমডি জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের আমবাগানে দেশের সর্বোচ্চ ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৩০০ মিমি, চট্টগ্রাম নগরীতে ২৪৯ মিমি, বান্দরবানে ২৩৫ মিমি, রাঙ্গামাটিতে ১৩০ মিমি ও কক্সবাজারে ১২৫ মিমি বৃষ্টি হয়েছে।
ভূমিধসের ঝুঁকি ও সতর্কতা
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, মাটি সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ি জেলাগুলোতে নতুন করে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। কর্মকর্তারা বন্যা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সক্রিয় মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই বলে আগামী দুই দিন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



