বরগুনার পাথরঘাটায় সুপেয় পানির সংকট: দেড়শ বছরের পুকুর পরিত্যক্ত, হাহাকার
দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বিষখালী নদী এবং পশ্চিমে বলেশ্বর নদী—তিন দিকেই অথৈ জলবেষ্টিত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা। অথচ এই জলঘেরা জনপদেই তীব্র সুপেয় পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লক্ষাধিক মানুষ। উপকূলীয় বৈশিষ্ট্য, লবণাক্ততা এবং ভূগর্ভস্থ পানির সীমাবদ্ধতার কারণে এখানকার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
কালিবাড়ি গ্রামের দেড়শ বছরের পুকুর পরিত্যক্ত
এরই মধ্যে কাঠালতলী ইউনিয়নের কালিবাড়ি গ্রামের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো একটি পুকুর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। একসময় গ্রামবাসীর প্রধান পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত পুকুরটি বর্তমানে ভরাট ও দূষিত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে এ পুকুরের ওপর নির্ভরশীল প্রায় দেড় হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পুরো উপজেলাজুড়েই পানির জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অবস্থান কর্মসূচি ও দাবি
রোববার (৫ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে শতাধিক নারী-পুরুষ খালি কলসি হাতে পুকুরপাড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা দ্রুত পুকুরটি পুনঃখনন এবং নিরাপদ পানির স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান। কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী আমরা ধরা’র পাথরঘাটা উপজেলা সমন্বয়কারী, উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউপি সদস্য জসিম তালুকদার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনএসএস-এর নার্গিস পারভীন মুক্তি, রাজিব হাসান, নিভা তালুকদার, সমীর কুলু, শৈলেন মাঝি, শুভঙ্কর মাঝি, কাকলী রানী, জোৎস্না রানী ও নুপুর রানীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
ভূগর্ভস্থ পানির সমস্যা ও স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পাথরঘাটা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পাথরের উপস্থিতির কারণে ডিপ টিউবওয়েল বা শ্যালো টিউবওয়েল স্থাপন করা প্রায় অসম্ভব। কোথাও স্থাপন করা গেলেও পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও আয়রনের কারণে তা ব্যবহারযোগ্য থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ পুকুরের পানি পরিশোধন করেই ব্যবহার করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা সমীর কুলু ও শৈলেন মাঝি বলেন, শুষ্ক মৌসুম এলেই অধিকাংশ পুকুর শুকিয়ে যায়। তখন পানির জন্য চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এই পুরোনো পুকুরটি পুনঃখনন করা হলে অন্তত কিছুটা সংকট লাঘব হতো।
অপরদিকে নুপুর রানী ও কাকলী রানী জানান, গৃহস্থালির কাজের জন্য এই পুকুরই ছিল একমাত্র ভরসা। এখন পানির রঙ কালচে-লালচে হয়ে গেছে, যা ব্যবহার করতে ভয় লাগে।
কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
ইউপি সদস্য জসিম তালুকদার বলেন, পুকুরটি পুনঃখনন এবং একটি পানি পরিশোধন (ফিল্টার) ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রধান অতিথি শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের পানি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। পাথরঘাটার মতো এলাকায় পুকুরই প্রধান ভরসা। তাই পুকুর সংরক্ষণ, পুনঃখনন এবং বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎচালিত পানি সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। এলাকাবাসীর দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে।



