টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে পাঁচ শ্রমিক নিহত, বাসের জ্বালানি শেষ হওয়ায় দুর্ঘটনা
ছিন্নভিন্ন মরদেহগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেঙ্গুরে এলাকায় একটি বাসের জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীরা রেললাইনে বসে ছিলেন। এ সময় দ্রুতগতির একটি ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে পাঁচজন নিহত হন। নিহতরা সবাই গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার পূর্ব নিজপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই শিল্প এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক।
দুর্ঘটনার বর্ণনা প্রত্যক্ষদর্শীর জবানিতে
প্রত্যক্ষদর্শী নূর ইসলাম ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ঈদের ছুটি কাটিয়ে সুলতানসহ কয়েকজন শ্রমিক একই বাসে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। সকাল ১০টার দিকে সাদুল্যাপুর থেকে বনশ্রী পরিবহনের একটি ভাড়া করা বাসে রওনা হন তারা। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সন্ধ্যার পর বাসটি যমুনা সেতু অতিক্রম করে কালিহাতীতে পৌঁছায়। কিন্তু ধলাটেঙ্গুর এলাকায় এসে বাসের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে বাস থামিয়ে চালকের সহকারী তেল আনতে যান। যাত্রীরা এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অন্ধকার সন্ধ্যায় অপেক্ষা করতে থাকেন।
নূর ইসলাম বলেন, "গরমে বাসের ভেতর থাকা কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। কেউ কেউ বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়ান, কেউ বসেন পাশের রেললাইনে। এ সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিরাজগঞ্জগামী ‘সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি দ্রুতগতিতে এলে তার নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই মা–ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হন।"
নিহতদের পরিচয় ও স্বজনদের বেদনা
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সুলতান ছাড়াও আছেন নার্গিস (৩৫), তাঁর ছেলে নিরব (১২), নার্গিসের বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা (৩৫) ও রিফা (২৩)। নার্গিসের খালাতো বোন মুন্নী বেগম বলেন, সকালে রওনা দেওয়ার পর কয়েক দফায় নার্গিসের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে কথা হয়। দুপুরে তীব্র যানজটের কথা বলেছিলেন। সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে শেষবার ফোনে জানিয়েছেন, তাঁরা যমুনা সেতুর কাছাকাছি। এরপর আর কথা হয়নি। পরে ফোন আসে দুর্ঘটনার খবর নিয়ে।
মুন্নী বেগম আরও বলেন, "খবর পেয়ে রাত নয়টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, চারদিকে কান্না আর স্বজনদের বিলাপ। চোখের সামনে সহযাত্রীদের হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েন অন্য যাত্রীরা।"
যাত্রীদের বক্তব্য ও দায়ী চিহ্নিতকরণ
একই বাসের যাত্রী মায়া বেগম বলেন, "তাঁরা সবাই একই এলাকার মানুষ, একই এলাকায় কর্মস্থল। তাই ভাড়া করা গাড়িতে একসঙ্গেই ফিরছিলেন। রাস্তায় অনেক গাড়ি চলছিল। গাড়ির শব্দে কেউ ট্রেন আসার শব্দ শুনতে পারেনি। তাই রেললাইনে বসে থাকা সহযাত্রীরা চোখের পলকে ট্রেনের নিচে কাটা পড়েন।"
এ দুর্ঘটনার জন্য বাসটির চালক ও তাঁর সহকারীকে দায়ী করে নার্গিসের স্বামীর ভাগনি রিয়া আক্তার বলেন, "পর্যাপ্ত তেল ছাড়া গাড়ি কীভাবে রওনা হয়? তাঁদের বিচার দাবি করছি।"
পুলিশের ব্যবস্থা ও লাশ হস্তান্তর
টাঙ্গাইল রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বলেন, বাসটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক ও তাঁর সহকারী পলাতক। স্বজনদের আবেদনে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ শনিবার ভোরে স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে গ্রামের পথে রওনা দিয়েছেন।
নার্গিসের প্রতিবেশী আবদুল মোমিন আজ সকালে মুঠোফোনে জানান, ভোর চারটার দিকে তাঁরা মরদেহ নিয়ে রওনা করেছেন। সকাল আটটার দিকে গ্রামে পৌঁছে দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।



