২০ বছরেও ফ্ল্যাট পেলেন না জমির মালিকরা, ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ
২০ বছরেও ফ্ল্যাট পেলেন না জমির মালিকরা

‘এক বিঘার এই প্লটে আমাদের দোতলা বাড়ি ছিল। এই বাড়িতেই আমার বিয়ে হয়েছে। আমরা ভাইবোন মিলে সাত জন এই জমির মালিক। ২০০৬ সালে ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়। ঐ বছরেই বাড়ি ভেঙে জমি বুঝে নেয় কোম্পানি। কথা ছিল তিন বছরের মধ্যে কয়েকটি উঁচু ভবন হবে। অর্ধেক ফ্ল্যাট কোম্পানি পাবে, অর্ধেক আমরা পাব। ২০ বছর হতে চলল। এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ভবনের স্ট্রাকচার হয়েছে। আর কিছুই হয়নি। কোম্পানির কাউকেও খুঁজে পাই না। সবকিছু পরিত্যক্ত। এর মধ্যে আমার ভাইবোনদের মধ্যে মাত্র আমি ও এক ভাই বেঁচে আছি। অন্যরা ইতিমধ্যে মারা গেছেন। আমরা এখন ভাড়া বাসায় থাকি। ছোট ভাই স্ট্রোক করে অসুস্থ অবস্থায় ভাড়া বাসায় থাকছেন, অর্থের অভাবে ঠিকমতো বাসা ভাড়াও দিতে পারছেন না। কী করব, জানি না, চোখে অন্ধকার দেখছি।’ কথাগুলো অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক শায়লা রহমানের। বয়স ষাটোর্ধ্ব। থাকেন রাজধানীর ধানমন্ডির ১০/এ নম্বর সড়কে। এই সড়কেরই ৩৬ নম্বর প্লটটি তাদের। এক বিঘার এই প্লটে কয়েকটি উঁচু ভবন নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালে চুক্তি হয় ডেভেলপার কোম্পানি ‘ডোম-ইনো বিল্ডার্স লিমিটেড’-এর সঙ্গে।

চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও ২০ বছরেও কাজ হয়নি

চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে সবগুলো ভবন নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তবে, এই ২০ বছরে মাত্র দুটি ভবনের স্ট্রাকচার হয়েছে। পুরো জায়গাটি এখন ময়লা পানির ডোবা, মশা-মাছির আস্তানা। ভবন নির্মাণের আগেই কোম্পানি সেখানে অনেকের কাছে ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি করে টাকা নিয়েছে। এখন জমির মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের মাথায় হাত। কবে স্বপ্নের ভবন-ফ্ল্যাট পাবেন সেটি শুধু অজানাই নয়, পুরো অনিশ্চিত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শায়লা রহমানের মতো অন্তত ৮০ জন জমির মালিক একই অবস্থায়

শায়লা রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘নিজেদের জমি ও বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। অসুস্থ ছোট ভাইটি অর্থের অভাবে চিকিত্সাও করাতে পারছেন না, বাসা ভাড়া দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোম্পানির মালিককে খুঁজে পাচ্ছি না, তার অফিসে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায় না। যখন চুক্তি করেছিলাম তখন আমরা সব ভাইবোন বেঁচে ছিলাম। এখন আছি মাত্র দুই জন। মারা যাওয়া ভাইবোনেরা নিজেদের জমিতে স্বপ্নের ভবন দেখে যেতে পারলেন না। আমরাও মৃত্যুর আগে দেখতে পারব কিনা জানি না। এর সমাধান কী সেটাও জানি না।’ এমন গল্প শুধু শায়লা রহমানের নয়। অন্তত ৮০ জন জমির মালিকের প্রায় অভিন্ন গল্প। সবার বাড়ি ভেঙে জমি দখলে নিয়ে ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যেও ভবন নির্মাণ করেনি ডোম-ইনো। নিজেদের বাড়ি ভেঙ্গে জমি কোম্পানিকে বুঝিয়ে দিয়ে বছরের পর বছর ধরে থাকতে হচ্ছে ভাড়া বাসায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্পগুলো এখন ডোবা ও মাদকের আখড়ায় পরিণত

ডোম-ইনোর প্রতারণার কবলে পড়া এরকম কয়েকটি প্রকল্প সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ প্রকল্পেই ফাউন্ডেশন করা। পিলারের ওপর অংশের রডগুলোতে মরিচা পড়েছে। ডোবায় পরিণত হওয়া পানিতে মশা-মাছির আখড়া। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। আবার কোথাও কোথাও কিছু ভবনে স্ট্রাকচার পর্যন্ত হয়েছে। চারদিকে ইটের দেওয়াল কিংবা টিন দিয়ে ঘেরাও করা থাকলেও নেই কোনো প্রহরী। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যা নামলেই সেখানে মাদকসেবীদের উত্পাত শুরু হয়। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

ডোম-ইনোর মালিক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা

ভুক্তভোগী অন্তত ১০ জন প্লট মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডোম-ইনোর মালিক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। একটি মামলায় কিছুদিন আগে তার চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র দায়রা জজ। দুটি আরবিটেশন মামলায় ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা করে জরিমানা হয়েছে তার। এই দুটি মামলায় জমির মালিকের দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নিও বাতিল করেছে আরবিটেশন কোর্ট। শতাধিক মামলার মধ্যে অন্তত ২৫টিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। এসব দণ্ড ও পরোয়ানা মাথায় নিয়ে অফিস-বাসা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আব্দুস সালাম। ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি করে শত শত মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) অভিযোগ রয়েছে।

আব্দুস সালাম আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যের ভাই

উল্লেখ্য, এই আব্দুস সালাম হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লার সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর খানের ভাই।

ভুক্তভোগীদের দাবি আইন সংশোধনের

ডোম-ইনোর এমন ভয়ংকর প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা জানান, চুক্তি অনুযায়ী ভবন নির্মাণের কাজ না করায় অর্থের অভাবে তারা আরবিটেশন কোর্টেও যেতে পারছেন না। এই কোর্টে যেতে ৫০ লাখ থেকে এক কোটির বেশি টাকা লাগে। তাও রায় একজনের পক্ষে গেলে আরেকজন না মানলে আবার যেতে হয় আদালতে। এভাবে চলে যায় বছরের পর বছর। তারা জানান, বিদ্যমান আইনটি ডেভেলপারের পক্ষে। চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনে জমির মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের যথাসময়ে ফ্ল্যাট প্রাপ্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। এখন এমন বিপদের মধ্যে পড়েও তারা চুক্তি বাতিল করতে পারছেন না। আইনে সেই সুযোগও নেই। তাদের দাবি, ভবন নির্মাণের জন্য যেই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তারা কোম্পানিকে দিয়ে থাকেন সেটি লাইফ টাইম। সরকারের উচিত এই আইনে সংশোধনী এনে জমির মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের যথাসময়ে প্রাপ্য নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে ডোম-ইনোতে প্রশাসক বসিয়ে উদ্ভূত সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে তারা সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।