মাচা ভেঙে দগ্ধ গৃহবধূর মৃত্যু, স্বামী-সন্তান আইসিইউতে সংকটে
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মেঘনা নদীর চরে একটি টংঘরে রান্না করার সময় মাচা ভেঙে পড়ার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার স্বামী ও ছয় বছরের শিশুকন্যা গুরুতর দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে মৃত্যুশয্যায় রয়েছেন।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
গত ১৫ এপ্রিল বুধবার দুপুরে কমলনগর উপজেলার ১নং কালকিনি ইউনিয়নের মতিরহাট সংলগ্ন মেঘনার চর শামসুদ্দিনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ভূমিহীন কৃষক আলাউদ্দিন (৪০) মেঘনার ওই চরে একটি উঁচু টংঘর তৈরি করে বর্গাচাষি হিসেবে সপরিবারে বসবাস করতেন। জোয়ারের পানি থেকে বাঁচতে চরের ঘরগুলো সাধারণত উঁচুতে মাচা বা পাটাতন করে তৈরি করা হয়।
ঘটনার দিন দুপুরে আলাউদ্দিন মাঠের কাজ সেরে ঘরের ওপরের পাটাতনে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, পাশে ঘুমচ্ছিল ছোট মেয়ে সানজিদা। ঘরের এক কোণে স্ত্রী হালিমা বেগম (৩৫) দুপুরের রান্না করছিলেন। হঠাৎ জরাজীর্ণ মাচাটি ভেঙে পড়লে জ্বলন্ত চুলা ও ফুটন্ত ভাতের পাতিলসহ সবাই নিচে পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের শিখা ও গরম ভাতের মাড়ে ঝলসে যায় মা-বাবা ও সন্তানের শরীর।
মৃত্যু ও চিকিৎসার অবস্থা
মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হালিমা বেগম। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সুতারগোপটা এলাকার গণকবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। মৃতের স্বজন আবদুল কাদের জানান, হালিমা বেগমের শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। এক সপ্তাহ লড়াই করে তিনি চলে গেলেন।
চিকিৎসাধীন আলাউদ্দিনের শরীরের ৯ শতাংশ এবং শিশু সানজিদার ১৪ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। বর্তমানে ঢামেক বার্ন ইউনিটে তারা চিকিৎসাধীন। পরিবারটি এতটাই নিঃস্ব যে প্রতিদিনের চিকিৎসার খরচ চালানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সহায়তা ও আবেদন
ঘটনার পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় দগ্ধ তিনজনকে উদ্ধার করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে এ অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ান কমলনগর উপজেলা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আহ্বায়ক মুফতি শরীফুল ইসলাম। তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা বার্ন ইউনিটে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
মুফতি শরীফুল ইসলাম জানান, হালিমা বেগমকে বাঁচানো সম্ভব না হলেও তার স্বামী ও সন্তান এখনো আইসিইউতে কাতরাচ্ছে। তিনি সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের কাছে এই অসহায় পিতা ও সন্তানের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসার আকুল আবেদন জানান।
স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান লিটন ও এলাকাবাসী জানান, ভূমিহীন এই পরিবারটি চরে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দিনাতিপাত করত। এক নিমেষেই সব শেষ হয়ে গেল। তারা এই অসহায় পরিবারটিকে পুনর্বাসন এবং চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাহাত উজ-জামান ছুটিতে থাকায় দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ আরাফাত হোসাইন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির পক্ষে একটি আবেদন দেওয়া হলে, সেই অনুযায়ী পরিবারটিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হবে।
এই ঘটনা সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা ও চিকিৎসা সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে, যা সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।



