ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় অবস্থিত বহুল আলোচিত ভোজশালা মন্দির–কামাল মাওলানা মসজিদ কমপ্লেক্সের বিতর্কিত অংশকে সরস্বতী দেবীর মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। শুক্রবার (১৫ মে) দেওয়া এক রায়ে আদালত ২০০৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই) কর্তৃক জারি করা নির্দেশ বাতিল করে। ওই নির্দেশের আওতায় মুসলিমরা ভোজশালা প্রাঙ্গণে জুমার নামাজ আদায়ের অনুমতি পেতেন।
আদালতের রায় ও নির্দেশনা
রায়ে আদালত জানিয়েছে, ভোজশালার সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে এএসআইয়ের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে। তবে ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার হিন্দু পক্ষের কাছেই থাকবে। একইসঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়কে পৃথক স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে জমি চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আদালত।
বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা ও বিচারপতি অলোক আওয়াস্থির বেঞ্চ রায়ে উল্লেখ করেন, ভোজশালায় সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র ও সরস্বতী দেবীর মন্দির থাকার ঐতিহাসিক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আদালত বলেন, ‘এখানে হিন্দু উপাসনার ধারাবাহিকতা কখনো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি। ঐতিহাসিক দলিল ও সাহিত্য থেকে প্রতীয়মান হয়, বিতর্কিত স্থানটি পরমার রাজবংশের রাজা ভোজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র ‘ভোজশালা’ ছিল।’
দুই পক্ষের দাবি
হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি, ভোজশালা মূলত সরস্বতীর মন্দির এবং এটি নির্মাণ করেছিলেন জ্ঞানপিপাসু রাজা ভোজ। অন্যদিকে মুসলিম পক্ষের বক্তব্য, স্থানটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কামাল মাওলানা মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, বর্তমানে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত সরস্বতী দেবীর প্রাচীন মূর্তিটি ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকার যেন আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেয়। রায়ে বলা হয়, পরমার রাজবংশের রাজা ভোজ ১০১০ থেকে ১০৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ওই মূর্তিটি স্থাপন করেছিলেন, যখন ভোজশালা ছিল একটি বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র।
বেঞ্চ জানায়, ‘এএসআই সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পূর্ণ তদারকি করবে। লন্ডন মিউজিয়াম থেকে সরস্বতীর মূর্তি ফিরিয়ে এনে ভোজশালা কমপ্লেক্সে পুনঃস্থাপনের বিষয়ে আবেদনকারীরা সরকারের কাছে একাধিক আবেদন করেছেন। সরকার চাইলে বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।’
আইনি প্রক্রিয়া ও জরিপ
বিভিন্ন ধর্মীয় দাবি, ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা, জটিল আইনি প্রশ্ন ও হাজারো নথি পর্যালোচনার পর গত ১২ মে আদালত রায় সংরক্ষণ করেছিলেন। ২০০৩ সালের এএসআই ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী, মঙ্গলবার হিন্দুরা এবং শুক্রবার মুসলিমরা সেখানে প্রার্থনা করতেন। তবে হিন্দু পক্ষ আদালতে একক উপাসনার অধিকার দাবি করে ওই নির্দেশনার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানায়।
২০২৪ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট ভোজশালা–কামাল মাওলানা মসজিদ কমপ্লেক্সে বৈজ্ঞানিক জরিপের নির্দেশ দেয়। এরপর ২২ মার্চ জরিপ শুরু করে এএসআই এবং ৯৮ দিনের বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়।
দুই হাজারের বেশি পৃষ্ঠার সেই প্রতিবেদনে এএসআই দাবি করে, বর্তমান বিতর্কিত স্থাপনার আগে সেখানে পরমার রাজাদের আমলের একটি বিশাল স্থাপনা ছিল এবং বর্তমান কাঠামো নির্মাণে মন্দিরের বিভিন্ন উপাদান পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে। হিন্দু পক্ষের দাবি, জরিপে পাওয়া মুদ্রা, ভাস্কর্য ও শিলালিপি প্রমাণ করে যে স্থানটি মূলত একটি মন্দির ছিল। তবে মুসলিম পক্ষ আদালতে দাবি করে, এএসআইয়ের প্রতিবেদন ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং হিন্দু আবেদনকারীদের দাবিকে সমর্থন করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।



