ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্যের ইঙ্গিত
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলমান বৈরিতা, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হুমকি ও সংঘাতের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ঘোষণার ঘটনা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন উপায়ে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, নাশকতামূলক অভিযান, হাইব্রিড যুদ্ধ, লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড এবং ক্রমাগত সামরিক হামলার হুমকি—সবই প্রয়োগ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করতে বাধ্য করা, তার প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা সীমিত করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনা। কিন্তু ৪৭ বছর পর দেখা যাচ্ছে, ফলাফল ওয়াশিংটনের প্রত্যাশার অনেক নিচে থেকে গেছে।

একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর আরোপিত সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞাগুলোর মুখোমুখি হয়েও ইরান তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রেখেছে, উল্লেখযোগ্য শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, অঞ্চলের অন্যতম উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নির্মাণ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় ঘটনাপ্রবাহে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছে। এখন যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, তা এই নতুন বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে।

চুক্তির সম্ভাব্য শর্তাবলি

ইরানি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে এই চুক্তির মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা, নৌ অবরোধ ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা এবং ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানানো ও তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। সম্ভবত এই চুক্তির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—কোন বিষয়গুলো আলোচনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর প্রতি দেশটির সমর্থনের বিষয়টি আলোচনার এজেন্ডা থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

এটি মোটেও ছোটখাটো কোনো বিষয় নয়। বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি ও মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো জোর দিয়ে বলে এসেছে, তেহরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির শর্ত হিসেবে ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা ধ্বংস করতে হবে এবং অঞ্চলজুড়ে প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। এই বিষয়গুলো আলোচনার বাইরে রাখা ইঙ্গিত দেয়, আলোচকেরা শেষ পর্যন্ত সেই বাস্তবতাই মেনে নিয়েছেন, যা আঞ্চলিক পরিস্থিতি অনেক আগেই প্রমাণ করেছে: এমন দাবি বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না।

লেবানন ও ইসরায়েলের অবস্থান

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লেবানন। ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তির আগে আলোচনায় লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা, সীমান্ত এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে কিছু নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, লেবানন–সংক্রান্ত কোনো ধারা মানতে ইসরায়েল নিজেকে বাধ্য মনে করে না। এই বিরোধ যেভাবেই এগোক না কেন, ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে মধ্যপ্রাচ্য নীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক জায়গায় মিলছে না।

হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় নিরাপত্তা

হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের তেল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে অতিক্রম করে। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান আলোচনাগুলো ইঙ্গিত করছে, এখানে সরাসরি ইরান ও আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে সমন্বয়ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। বাস্তবিক অর্থে এটি উপসাগরীয় নিরাপত্তায় ইরানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার স্বীকৃতি।

অবশিষ্ট মতপার্থক্য

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সব উত্তেজনা শেষ হয়ে গেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এ ছাড়া তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ইতিহাস সতর্ক থাকার পরামর্শ দেয়। অতীতেও বিভিন্ন চুক্তি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বা দুর্বল করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যা দ্রুত দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

তবু এ মুহূর্তের রাজনৈতিক গুরুত্বকে খাটো করে দেখা উচিত হবে না। সুতরাং এখানে যে বিষয়টি নির্ধারণের মুখে রয়েছে, তা কেবল একটি পারমাণবিক চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত আমরা মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির নতুন ভারসাম্য স্বীকার করার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করছি।

উপসংহার

মূল প্রশ্ন শুধু স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া নথির বিষয়বস্তু নয়। এর গভীরতর বাস্তবতা হলো প্রায় পাঁচ দশকের সংঘাতের পর ওয়াশিংটন হয়তো অবশেষে সেই বাস্তবতা স্বীকার করছে, যা ঘটনাপ্রবাহ ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে: মধ্যপ্রাচ্যের গতিপথ এককভাবে নির্ধারণ করার যে যুগে যুক্তরাষ্ট্র ছিল একচ্ছত্র শক্তি, সেই যুগ ধীরে ধীরে শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সাইদ মার্কোস তেনোরিও একজন ইতিহাসবিদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিশেষজ্ঞ। মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।