চীনের নতুন নির্দেশ: আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মানা যাবে না
চীনের নির্দেশ: আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২ মে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছে, যা ২০২১ সালে তৈরি এক আইনের আওতায় দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশের লক্ষ্য বিদেশি আইনের অন্যায্য চাপ ঠেকানো। সহজ ভাষায়, এতে বলা হয়েছে—চীনের কিছু তেল শোধনাগারের ওপর আমেরিকা যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তা চীনের ভেতরে মানা যাবে না এবং কার্যকর করা যাবে না।

পাঁচটি চীনা রিফাইনারি

যে পাঁচটি চীনা রিফাইনারিকে নিশানা করে এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল (দালিয়ান), শানডং জিনচেং পেট্রোকেমিক্যাল গ্রুপ, হেবেই শিনহাই কেমিক্যাল গ্রুপ, শৌগুয়াং লুকিং পেট্রোকেমিক্যাল এবং শানডং শেংসিং কেমিক্যাল। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, তারা ইরান থেকে তেল কিনছে।

চীনের আইনি পদক্ষেপ

চীনের এই পদক্ষেপ শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ নয়। এর আগে চীন অনেক সময় মুখে আপত্তি জানিয়েছে, কিন্তু এবার তারা সরাসরি আইন করে সে আপত্তির বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ তারা জানিয়ে দিল—ইরানের সঙ্গে তেল–বাণিজ্য রক্ষায় তারা আইনি শক্তিও প্রয়োগ করবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমেরিকার চাপ

অন্যদিকে, আমেরিকা অনেক দিন ধরেই ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে তাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল বিক্রি কমিয়ে দেওয়া।

গত এপ্রিলের ২৪ তারিখে হেংলি পেট্রোকেমিক্যালকে আমেরিকার কালোতালিকায় তোলা হয়। বলা হয়, তারা বিপুল পরিমাণ ইরানি তেল কিনেছে, এমনকি গোপন জাহাজ ব্যবস্থার মাধ্যমেও লেনদেন করেছে। তবে তাদের কিছু সময় দেওয়া হয় ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার জন্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চীনের কৌশলগত বার্তা

চীনের নতুন নির্দেশটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এতে বলা হয়েছে—আমেরিকার এই নিষেধাজ্ঞা তারা মানে না। এমনকি দেশের ভেতরে কেউ যদি তা মানতে চায়, সেটাও আইনত বাধা দেওয়া হবে। চীন এর জন্য আরেকটি আইনও ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে তারা বিদেশি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নিজেদের কোম্পানিকে রক্ষা করতে পারে। এর ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিন্তে ব্যবসা চালাতে পারবে, আর অযথা ভয় পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেবে না।

ইরানের তেলের গুরুত্ব

ইরানের তেল চীনকে সুবিধা দেয়—খরচ কমায়, বিকল্প বাড়ায় এবং অন্য দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির শক্তি বাড়ায়। আবার চীনের বাজার ইরানের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই সম্পর্ক চট করে ভাঙা কঠিন।

এই পদক্ষেপের বড় লক্ষ্য আমেরিকার ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ দুর্বল করা। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা সরাসরি আমেরিকার নাগরিকদের জন্য নয়, বরং অন্য দেশের কোম্পানিগুলোকেও চাপ দেয়, যাতে তারা নিষিদ্ধ দেশের সঙ্গে ব্যবসা না করে। চীন ঠিক এই চাপটাই ভাঙতে চাইছে।

ভবিষ্যৎ প্রভাব

চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য এটি একধরনের সুরক্ষা। এতে বলা হচ্ছে—আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বৈধ নয়, তাই তা মানার দরকার নেই। এমনকি বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও সতর্ক করা হচ্ছে—যদি তারা এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চীনা কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাহলে চীনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।

এর ফলে চীন ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকেও এগোতে পারে। ইরানের সঙ্গে তেল–বাণিজ্যে তারা নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করতে পারে, বা অন্য বিকল্প পদ্ধতিতে লেনদেন করতে পারে।

তবে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এখনো সতর্ক থাকবে। তারা হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা এড়িয়ে চলবে বা নিজেদের কাজ ভাগ করে নেবে। একদিকে থাকবে আমেরিকা, অন্যদিকে চীন। ফলে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা না হলেও ব্যবসার পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা

চীনের এই সিদ্ধান্তের পেছনে জ্বালানিনিরাপত্তার বড় ভূমিকা আছে। তাদের অনেক তেল আসে এমন দেশ থেকে, যেগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছে। তাই এই সরবরাহ চালু রাখা তাদের জন্য জরুরি।

এই নির্দেশ তাই শুধু আইনি সিদ্ধান্ত নয়, একটি কৌশলগত বার্তাও। এতে বলা হচ্ছে—চীন তার অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত এলে চুপ করে থাকবে না।

অনেক দিন ধরে চীন আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা লাভও করেছে। যেমন—তারা কম দামে তেল কিনতে পেরেছে। কিন্তু এবার তারা সরাসরি মোকাবিলার পথে হাঁটছে। এতে বোঝা যায়, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।

ইরানের জন্য সুসংবাদ

ইরানের জন্য এটি ভালো খবর। এতে বোঝা যাচ্ছে, সব দেশ আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মানে না। আর আমেরিকার জন্য এটি নতুন চ্যালেঞ্জ, কারণ এতে তাদের চাপ প্রয়োগ কঠিন হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে, চীনের এই পদক্ষেপ একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বোঝা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞার লড়াই শুধু অর্থনৈতিক থাকবে না, আইনি লড়াইও বাড়বে।

এখন দেখার বিষয়—চীন কতটা কঠোরভাবে এই আইন বাস্তবায়ন করে। যদি তারা শক্তভাবে আইনটি প্রয়োগ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সমস্যা তৈরি হবে। আর যদি শুধু কথার মধ্যে থাকে, তাহলে এটি মূলত রাজনৈতিক বার্তাই হয়ে থাকবে।

বিশ্ব তেল বাজারে অনিশ্চয়তা

বিশ্ব তেল বাজারের জন্যও এটি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেলের ব্যবসা এখন আরও বেশি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে, আর আর্থিক ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।

এই ঘটনাটি দেখাচ্ছে—একটি বড় অর্থনীতির বিরুদ্ধে একতরফা চাপ সব সময় কাজ করে না। আর চীন দেখিয়ে দিচ্ছে—আইন ব্যবহার করেও কীভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

দীর্ঘ মেয়াদে এটি হয়তো শুধু কয়েকটি কোম্পানিকে ঘিরে ঘটনা হিসেবে থাকবে না। বরং এটি এমন এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত, যেখানে এক দেশের চাপের জবাব অন্য দেশ আইনের মাধ্যমে দেবে।

উমুদ শোকরি জ্বালানি কৌশলবিদ ও গালফ স্টেট অ্যানালিটিকস-এর উপদেষ্টা। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।