মেধাবী লিমনের শেষ যাত্রা: কফিনে চড়ে দেশে ফেরা
মেধাবী লিমনের শেষ যাত্রা: কফিনে চড়ে দেশে ফেরা

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, পরিবারকে ঘিরে শত আশা আর দেশকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছা— সবকিছুই যেন একসঙ্গে থেমে গেল জামিল আহমেদ লিমনের (২৭) মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার এই মেধাবী তরুণের শেষ যাত্রা হলো কফিনবন্দী হয়ে নিজের জন্মভূমিতে ফেরা দিয়ে। যে পথ ধরে তিনি গিয়েছিলেন জ্ঞান অন্বেষণে, সেই পথই শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনল নিথর দেহে।

জানাজায় শোকের বন্যা

সর্বশেষ (৪ মে) মাগরিবের নামাজের পর লালডোবা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় লিমনের জানাজা। এসময় পরিবার ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ। কান্নায় ভেঙে পড়ে শত শত মানুষ, এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। লিমনের মরদেহ এক নজর দেখার জন্য গ্রামের লোকজনের পাশাপাশি স্কুলের শিক্ষার্থীরাও ভিড় করে।

দেশে ফেরার পথ

এর আগে সোমবার সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে লিমনের মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। সেখানে সমবেদনা জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। পরে একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে ১৮৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দুপুর ৩টা ১২ মিনিটে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার লালডোবা গ্রামে তার পৈতৃক বাড়িতে পৌঁছানো হয়। এ সময় পুরো গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব-সবার চোখে অশ্রু, কণ্ঠে বেদনার ভার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শেষ বিদায়

তার জানাজায় অংশ নেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলসহ শত শত মানুষ। পরে পারিবারিক কবরস্থানে ছোট দাদুর কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় লিমনকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাবার বেদনা

লিমনের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা জহরুল হক। বুক চাপড়ে তিনি বলেন, ‘আমার যা গেছে, তা কোনোদিন ফিরে পাবো না। আমি শুধু চাই, আমার সন্তানের মতো আর কোনো ছেলে-মেয়ে যেন এমনভাবে না মরে। তারা দেশে হোক বা বিদেশে-সবাই যেন নিরাপদে পড়াশোনা করতে পারে।’ সন্তানের প্রতি তার মমতার কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। জহুরুল বলেন, ‘আমি কখনো আমার ছেলেকে কষ্ট দিইনি। একটা থাপ্পড়ও মারিনি, শুধু মুখে শাসন করেছি। তাহলে কেন তাকে এত কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হলো?’

জহুরুল আরও বলেন, ‘ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। আমরা যেটুকু জানি, তা মিডিয়ার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এমনকি এফবিআই তদন্ত করছে। তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। তদন্ত যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে আমরা আশাবাদী। তবে আমি চাই, যারা এই পিশাচের মতো কাজ করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’

লিমনের শিক্ষাজীবন

জামিল আহমেদ লিমন ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। বাবা-মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে তাদের বসবাস গাজীপুরে হলেও গ্রামের বাড়ি জামালপুরের লালডোবায়। শৈশব থেকেই মেধাবী লিমন পড়াশোনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাকে নিয়ে যায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে স্কলারশিপ অর্জন করে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান লিমন। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত নীতি এবং উন্নয়ন বিষয়ক গবেষণায় আগ্রহী ছিলেন লিমন। সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে তিনি ছিলেন শান্ত, মেধাবী ও পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও তার সুনাম ছিল।

নিখোঁজ ও মরদেহ উদ্ধার

গত ১৬ এপ্রিল হঠাৎ করেই নিখোঁজ হন লিমন। একই সময় নিখোঁজ হন তার পরিচিত নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৭)। কয়েকদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে এক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানালে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস তদন্তে নামে। ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার একটি সেতু সংলগ্ন এলাকা থেকে আবর্জনার ব্যাগের ভেতর লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। লিমনের দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার

এই হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে লিমনের রুমমেট মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে প্রথম ডিগ্রির হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে আরও বিভিন্ন তথ্য যাচাই করছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

যুক্তরাষ্ট্রে জানাজা

লিমনের মৃত্যুর পর ফ্লোরিডার টাম্পা বে এলাকায় একটি ইসলামিক সেন্টারে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা অংশ নেন। সবাই তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার দাবি করেন।

দেশে পাঠানো

গত শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ মিনিটে অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তার মরদেহ দেশে পাঠানো হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে তিনি ফিরলেন নিজের মাটিতে-তবে জীবিত নয়, নিথর দেহ হয়ে।

চাচার বক্তব্য

লিমনের চাচা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘লিমন ছিল আমাদের পরিবারের প্রদীপ। তাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু সে লাশ হয়ে ফিরবে-এটা কখনও কল্পনাও করিনি।’