জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আমেরিকার সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি ছাড়া ইউরোপের ভবিষ্যৎ কেমন হবে? এই প্রশ্নটি আর কল্পনার গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই; এটি এখন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ইউরোপীয়দের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে, কারণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে কার্যত অকার্যকর করে দিতে পারেন।
ন্যাটো ভাঙনের আশঙ্কা
ট্রাম্প হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহার করবেন, অথবা অবহেলা, উপেক্ষা ও অবজ্ঞার মাধ্যমে জোটটিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে তুলবেন। তিনি যে পথই ধরুন, শেষ ফল একই হবে: ন্যাটোতে ভাঙন। এই ভাঙন কোনো আকস্মিক ধাক্কা নয়; এটি এক দীর্ঘ ক্ষয়ের প্রক্রিয়া। ন্যাটোর মতো পরীক্ষিত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংহত জোট একদিনে ধসে পড়ে না। তা ভেঙে পড়ে তখনই, যখন তার মূল ভিত—পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার—ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই ক্ষয় আরও স্পষ্ট। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর বেছে নেওয়া বিতর্কিত ও বিপর্যয়কর সামরিক অবস্থানের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো তাঁর পাশে দাঁড়াতে অনীহা দেখানোয় এই আস্থাহীনতা আরও প্রকট হয়েছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
শীতল যুদ্ধের সূচনা থেকে শুরু করে তার পরবর্তী দশকগুলো পর্যন্ত ইউরোপের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি। আমেরিকার সামরিক ছায়াতলে ইউরোপ ধীরে ধীরে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। এই নিরাপত্তা-নিশ্চয়তাই ইউরোপকে অর্থনৈতিক সংহতির দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু ট্রাম্প ও তাঁর 'মাগা' দর্শনের কাছে এই ইতিহাসের কোনো মূল্য নেই। বরং নানা অস্পষ্ট, কখনো অসংলগ্ন যুক্তিতে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে এবং ইউরোপকে এমন এক যুগে ফিরিয়ে নিতে চায়, যেখানে আত্মঘাতী জাতীয়তাবাদই প্রধান চালিকা শক্তি।
বিপজ্জনক প্রবণতা
এই প্রবণতা কতটা বিপজ্জনক, তা বোঝা কঠিন নয়। ইউরোপ যদি আবার বিভক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক জাতীয়তাবাদের পথে ফিরে যায়, তবে তার প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও আঘাত করবে। তখন আমেরিকাও দুর্বল ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই যুক্তির কোনো দাম নেই। তাঁর ঘনিষ্ঠ আদর্শিক মিত্র হাঙ্গেরির নেতা ভিক্তর অরবানের নির্বাচনী পরাজয়ের পর ট্রাম্প আরও বেশি করে ইউরোপকে নিজের মতো চলতে দেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারেন।
ইউরোপের একাকী পথ
প্রায় আট দশকের মধ্যে এই প্রথম ইউরোপ এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাকে একাই পথ চলতে হতে পারে। নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সব দায়িত্ব নিতে হবে নিজেদের কাঁধে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি স্বাভাবিক ভূরাজনৈতিক রূপান্তর মনে হলেও ইউরোপের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর এবং উদ্বেগজনক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপ থেকে সরে দাঁড়ানো যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা জার্মানিতে হিটলারের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে। যদি সে সময় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ইউরোপে সক্রিয় থাকত, তাহলে জার্মান প্রতিশোধস্পৃহা এত সহজে শক্তি সঞ্চয় করতে পারত না।
ট্রুম্যানের শিক্ষা
এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম একটি মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইউরোপে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখেন। শুধু সোভিয়েত নেতা স্তালিনের নেতৃত্বাধীন লাল ফৌজ মোকাবিলার জন্য নয়, বরং ইউরোপের ভেতরে জার্মান পুনরুত্থান নিয়ে যে গভীর আশঙ্কা ছিল, তা প্রশমিত করার জন্যও ট্রুম্যান এটি করেছিলেন। এই মার্কিন উপস্থিতিই ইউরোপে আস্থার ভিত্তি তৈরি করে। এটি ধীরে ধীরে 'আরও ঘনিষ্ঠ ঐক্য'-এর দিকে ইউরোপকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এর ফলেই জার্মানির পুনরেকত্রীকরণ এবং পূর্ব ইউরোপে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্প্রসারণ সম্ভব হয়। এই প্রেক্ষাপট ছাড়া আজকের ইউরোপকে কল্পনা করাই কঠিন।
আমেরিকা-পরবর্তী ইউরোপ
কিন্তু এখন সেই ভিত্তিই নড়ে উঠছে। ফলে যে প্রশ্নটি অনিবার্য, তা হলো আমেরিকা-পরবর্তী ইউরোপ কেমন হবে? যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে কি ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে? নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্য ধরে রাখতে পারবে?
জার্মানির ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও সংবেদনশীল। ইউরোপে আধিপত্য বিস্তারের অতীত ইতিহাস থাকায় নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বর্তমান জার্মান নেতৃত্ব কি সেই ইতিহাসবোধ ও দায়িত্বশীলতা দেখাতে পারবে? জার্মানির অভ্যন্তরে ডানপন্থী শক্তি 'অল্টারনেটিভ ফুর ডয়েচল্যান্ড'-এর উত্থান ইঙ্গিত দেয়—এই পথ মোটেও মসৃণ নয়, বরং অনিশ্চয়তায় ভরা।
জার্মানি ও ফ্রান্সের ভূমিকা
বাস্তবতা হলো, ইউরোপের নেতৃত্বের প্রশ্নে জার্মানি ও ফ্রান্সের বিকল্প নেই। এই দুই শক্তিকেই এখন সামনে এসে শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে। এত দিন ইউরোপ যে অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিল (সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে এসে নেতৃত্ব দেবে), সেই যুগ শেষ হয়ে আসছে।
যশকা ফিশার জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস চ্যান্সেলর। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।



