পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে হাত মেলান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল ইসলামাবাদে শাহবাজ শরিফের সরকারি বাসভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। দেশটির এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইসলামাবাদে গতকাল প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও প্রতিরক্ষাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে ইরানের প্রতিনিধিদল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল রাতে মার্কিন প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফর বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রচেষ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর বাতিল আর ইরানে নতুন করে ইসরায়েলের হামলার হুমকিতে আবার যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফর
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে বৈঠক শেষে ইরানের প্রতিনিধিদল অবশ্য গতকালই ইসলামাবাদ ছেড়ে গেছে। তবে ইরানের প্রতিনিধিদলটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য বৈঠকে বসার আগে তাদের দাবিগুলো পাকিস্তানকে জানিয়ে দিয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ৩৯ দিনের হামলার পর ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়। এতে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান। স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করতে সেই পাকিস্তানেই ১১ ও ১২ এপ্রিল প্রায় ২১ ঘণ্টা বৈঠক করেন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। কিন্তু সেখানে দুই পক্ষের সমঝোতা হয়নি। তাই ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরে নৌ অবরোধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের কারণেই মূলত দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠক নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এর মধ্যেই প্রথম দফার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে গত বুধবার তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বৃদ্ধির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। পাশাপাশি পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। এর অংশ হিসেবেই গতকাল ইসলামাবাদে ইরানের প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, তেহরান ও ওয়াশিংটন বেশ কিছু বিষয়ে একমত হতে পারলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দেশটিতে আর কোনো হামলা হবে না—এ বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিশ্চয়তা, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণসহ নানা বিষয়ে বড় মতপার্থক্য রয়েছে।
অযৌক্তিক দাবি মেনে নেবে না তেহরান
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বৈঠকের পর পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানায়, দুই পক্ষই ‘আঞ্চলিক পরিস্থিতি’ নিয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। শাহবাজ শরিফের সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ আসিম মালিক ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি উপস্থিত ছিলেন। ইরানের প্রতিনিধিদলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে ছিলেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি, রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোকাদ্দাম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই প্রমুখ। বৈঠক শেষে পাকিস্তানের ইরান দূতাবাস জানিয়েছে, ইসলামাবাদ ও তেহরানের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, আরাগচি ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসার আগে তেহরানের আলোচনার শর্তাবলি ও মার্কিন দাবির বিষয়ে ইরানের আপত্তির বিষয়গুলো পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আলোচনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে তেহরানের আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামাবাদে নিযুক্ত ইরানের কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, ইরানের নীতিগত অবস্থান হলো তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অযৌক্তিক দাবি মেনে নেবে না।
এর আগে গতকাল সকালে আরাগচি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাবাহিনীর প্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করেন। সেই বৈঠক সম্পর্কে পাকিস্তান টিভি জানায়, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ও সামগ্রিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে সেখানে আলোচনা করা হয়েছে। ইরানের প্রতিনিধিদলটি গতকালই ইসলামাবাদ ছেড়ে ওমানে পৌঁছেছে। ওমানে পৌঁছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে আরাগচি লেখেন, ‘পাকিস্তান সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।... আমাদের অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য দেশটির (পাকিস্তানের) ভ্রাতৃপ্রতিম প্রচেষ্টাকে আমরা অত্যন্ত মূল্যায়ন করি।’ তবে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটনের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আরাগচি। তিনি পোস্টে লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির বিষয়ে সত্যিই কতটা আন্তরিক, তা দেখার এখনো বাকি আছে।’
এর আগে ইরানের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, আরাগচির নেতৃত্বাধীন ইরানের প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তান ছাড়াও ওমান ও রাশিয়া সফর করবে।
প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র
হোয়াইট হাউস গত শুক্রবার জানিয়েছিল, ইরানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য শনিবার (গতকাল) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছাবে। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার থাকবেন। তবে গতকাল ইরানের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ ছাড়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধিদল (পাকিস্তানে) যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিছুক্ষণ আগে আমি তাঁদের বললাম, না, আপনাদের যাওয়ার জন্য ১৮ ঘণ্টার এই দীর্ঘ ফ্লাইট ধরার দরকার নেই। সব কার্ড এখন আমাদের হাতে। তাঁরা (ইরানিরা) যখন খুশি আমাদের ফোন করতে পারেন। কিন্তু স্রেফ অর্থহীন আলোচনা করার জন্য আপনারা আর ১৮ ঘণ্টা উড়ে সেখানে যাবেন না।’
ইসলামাবাদে প্রতিনিধিদলের সফর বাতিল করার অর্থ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করা নয় বলেও মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে তিনি বলেন, ‘না। এর (সফর বাতিল) মানে তা নয়। আমরা এখনো এ নিয়ে (যুদ্ধ শুরু করার বিষয়ে) চিন্তাভাবনা করিনি।’ তবে ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের ওপর আস্থা রাখার মানুষ কমই পাওয়া যাবে। কারণ, গত বছরের জুনে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার মধ্যেই ইরানে হামলা চালিয়ে বসে ইসরায়েল। তাতে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্রও। আর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যখন মার্কিন–ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়, তখনো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
আবার যুদ্ধের আশঙ্কা
এই পরিস্থিতিতে ইরানে নতুন করে হামলার আশঙ্কা বেড়েছে। কারণ, ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল বিবিসির সরাসরি সম্প্রচারে (লাইভ) জানানো হয়, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, ‘খামেনি যুগের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাতে’ তাঁর দেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রের সবুজসংকেতের অপেক্ষায়’ রয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, সম্ভাব্য যেকোনো হামলার লক্ষ্য ইরানের সক্ষমতাকে সর্বাত্মকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া। কাৎজের এ মন্তব্যকে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। কাৎজের ব্যবহৃত শব্দগুলো থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এই অভিযানের সামরিক ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী।
কাৎজ বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। যেকোনো ধরনের রক্ষণাত্মক বা আক্রমণাত্মক পরিস্থিতির জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, প্রধান মিত্র ওয়াশিংটনের সঙ্গে চূড়ান্ত সমন্বয় সাপেক্ষে সব ধরনের সামরিক পথই খোলা রাখা হয়েছে। এদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তাদের বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা ‘ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর পাল্টা জবাবের’ মুখে পড়বে। ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া এক বিবৃতিতে জানায়, সশস্ত্র বাহিনী সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ও প্রস্তুতি অর্জন করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘আমরা অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও প্রস্তুত। এই অঞ্চলে শত্রুদের আচরণ ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আমরা কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছি। আবার যদি কোনো আগ্রাসন চালানো হয়, তবে আমরা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের শত্রুদের আরও ভয়াবহ ক্ষতি করতে বদ্ধপরিকর।’
জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা
দুই পক্ষের মধ্যে এমন উত্তেজনার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতাও বেড়েছে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাজারে প্রায় এক–পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ হতো। যুদ্ধ শুরুর পর জলপথটি প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের আগে তা ছিল ৭০ ডলারের কাছাকাছি। গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানির দাম ছিল ১০৫ ডলারের সামান্য বেশি।
বিবিসির ওয়ার্ল্ড নিউজ করেসপনডেন্ট জো ইনউডের মতে, ইসলামাবাদে দুই পক্ষের বৈঠক হলেও চলতি সপ্তাহের মধ্যে কূটনৈতিক কোনো অগ্রগতির তেমন একটা আশা ছিল না। তবে এই সময়ের মধ্যে অগ্রগতির যে আশাটুকু অবশিষ্ট ছিল, মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফর বাতিল হওয়ায় তা এখন পুরোপুরি উধাও হয়ে গেছে। যদিও মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গতকাল প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠক শেষে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে আলোচনা ও কূটনীতি অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। ইসলামাবাদ সেই তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।



