আয়ারল্যান্ডে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সভা: ঐক্য ও পুনর্গঠনের বার্তা
আয়ারল্যান্ডে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সভা: ঐক্যের বার্তা

আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বৃহত্তর সিলেটি কমিউনিটির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সংগঠন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, আয়ারল্যান্ডের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সাধারণ সভা প্রবাসী সমাজে নতুন করে ঐক্য, আত্মপরিচয় ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। গত মঙ্গলবার ডাবলিনের একটি কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সভা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন ছিল না, বরং এটি ছিল প্রবাসে সিলেটি অস্তিত্ব, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে এক গভীর ভাবনার ক্ষেত্র।

সভার সূচনা ও পরিচালনা

সভা শুরু হয় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে, যা পরিবেশন করেন তাজুল ইসলাম। সদস্যসচিব জসিম উদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় এবং আহ্বায়ক প্রভাষক আবদুস সহিদের সভাপতিত্বে সভা এগিয়ে যায় সুশৃঙ্খলভাবে। বৃহত্তর সিলেটের চার জেলার চারজন বিশিষ্ট মুরব্বি—সিতাব আলী (সিলেট), হারুন খান (সুনামগঞ্জ), রহিম উদ্দিন (মৌলভীবাজার) ও তাজুল ইসলাম (হবিগঞ্জ) অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তাঁদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে একটি মৌলিক সত্য—প্রবাসে টিকে থাকতে হলে বিভাজন নয়, দরকার ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও দূরদর্শী নেতৃত্ব।

সদস্যদের অংশগ্রহণ ও মতামত

আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন কাউন্টি থেকে আসা শতাধিক সিলেটবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে সভাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শুধু আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরাই নন, প্রায় ১৫ জন সাধারণ সদস্যও তাঁদের মতামত তুলে ধরেন, যা সংগঠনের ভেতরে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। বক্তারা একবাক্যে জোর দেন—একটি পূর্ণাঙ্গ, শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিটি গঠন এখন সময়ের দাবি। কারণ, একটি দুর্বল সংগঠন কমিউনিটিকে বিভক্ত করে আর একটি কার্যকর সংগঠন প্রবাসী সমাজকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করে তোলে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের ঐতিহাসিক ভূমিকা

এই প্রেক্ষাপটে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে সিলেটি অভিবাসনের ধারাবাহিকতায় ‘জালালাবাদ’ নামটি ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক পরিচয় থেকে প্রবাসী ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে সিলেটিদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ত্রাণসহায়তায় অর্থ সংগ্রহ, দুর্যোগকালে পাশে দাঁড়ানো এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং একটি প্রবাসী পরিচয়ের ভিত্তি।

আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ

একই সঙ্গে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে প্রবাসী সিলেটিদের মধ্যে ব্যবসা, শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং প্রবাসে বাংলা ও সিলেটি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনও সময়ের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, বিশেষ করে নেতৃত্ব সংকট, মতপার্থক্য এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন। এই প্রেক্ষাপটে ডাবলিনের এই সভা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেনি, বরং একটি সম্ভাব্য সমাধানের পথও দেখিয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আগামী আহ্বায়ক কমিটির বৈঠকে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে এবং চার জেলার মুরব্বিদের পরামর্শক্রমে একটি প্রতিনিধিত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

সভাপতির বক্তব্য ও ঐক্যের আহ্বান

সবশেষে সভাপতি প্রভাষক আবদুস সহিদ উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রবাসে কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে একটি গভীর বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়—ঐক্য হারালে পরিচয়ও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর সংগঠন দুর্বল হলে পুরো কমিউনিটিই পিছিয়ে যায়।

ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা

সার্বিকভাবে এই সভা প্রমাণ করেছে, প্রবাসী সিলেটি সমাজ এখনো ঐক্যবদ্ধ হতে চায় এবং একটি শক্তিশালী, কার্যকর সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে আগ্রহী। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনা ও প্রতিশ্রুতি কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায় এবং জালালাবাদ নামটি তার ঐতিহ্য ধরে রেখে নতুন প্রজন্মের জন্য কতটা কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।

তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও অস্বীকার করার সুযোগ নেই—সাম্প্রতিক সময়ে বৃহত্তর সিলেটি কমিউনিটির ভেতরে কিছু মতভেদ ও ভিন্নমত দেখা দিয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই ঐক্যের পথে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই মতপার্থক্যই শেষ কথা নয়; বরং সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এই ভিন্নমত দূর করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। বিভাজন নয়, ঐক্য—এ বার্তাই আজ প্রবাসী সিলেটি সমাজের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। নেতারা বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করবেন—এটাই সিলেটি কমিউনিটির প্রত্যাশা।