বুয়েনোস আইরেসের কোনো ক্যাফেতে বসে চোখ বন্ধ করলেই মনে হতে পারে আপনি দক্ষিণ আমেরিকায় নেই, বরং ইতালির নেপলস, জেনোয়া বা তুরিনের কোনো পাড়ায় ঢুকে পড়েছেন। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা কফি, মানুষের হাত নেড়ে কথা বলা, দুপুরে পাস্তা, রাতে পিৎজা—সবই যেন ইতালীয়। তাই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বিশ্বে একটি জনপ্রিয় ঠাট্টা চালু আছে— 'আর্জেন্টাইনরা হলো সেই ইতালিয়ান, যারা স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে!'
কেন আর্জেন্টিনার ৬০ শতাংশ মানুষ ইতালিয়ান?
আর্জেন্টিনার আধুনিক সমাজ গঠনে ইতালীয় অভিবাসনের প্রভাব অপরিসীম। গবেষকদের মতে, দেশটির ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ ইতালীয় বংশোদ্ভূত। ১৯শ শতকের শেষভাগে ইতালির রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে বাঁচতে লক্ষ লক্ষ ইতালীয় কৃষক ও শ্রমিক আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনায়।
সে সময় আর্জেন্টিনার শাসকগোষ্ঠীও দেশকে 'ইউরোপীয় ধাঁচে' গড়ে তুলতে বিপুল অভিবাসী চেয়েছিল। ফলে ইতালীয়দের জন্য আর্জেন্টিনার দরজা খুলে দেওয়া হয়। তারা কেবল নতুন ঠিকানাই পায়নি, বরং দেশটির সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে।
ইতালীয় প্রভাব: কেন শুনতে স্প্যানিশটা আলাদা?
আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রভাষা স্প্যানিশ হলেও, বুয়েনোস আইরেসের কথ্যভাষায় ইতালীয় সুরের জাদু স্পষ্ট। ভাষাবিদদের মতে, এই অঞ্চলের স্প্যানিশ উচ্চারণ, বাক্য বলার ছন্দ এবং নাটকীয়তা মূলত ইতালীয় অভিবাসীদের প্রভাবেই তৈরি। স্থানীয় স্ল্যাং বা আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডারেও ইতালীয় টোনের ব্যবহার এতই বেশি যে, বিদেশের অনেক পর্যটকের কাছে আর্জেন্টাইন স্প্যানিশকে 'ইতালীয় ঢঙের স্প্যানিশ' মনে হয়।
ঐতিহাসিক এক রূপান্তর
আর্জেন্টিনায় ইউরোপীয় অভিবাসন প্রক্রিয়ায় জনতাত্ত্বিক কাঠামো পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। একসময়ের আদিবাসী ও মিশ্র সংস্কৃতির দেশটিতে আজ ইতালীয় ও ইউরোপীয় প্রভাব এতই প্রকট যে, একে অনেক সময় 'ল্যাটিন আমেরিকার ইউরোপীয় দেশ' হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়। আধুনিক আর্জেন্টিনার শিল্প, সাহিত্য, খাবার এবং শহুরে জীবনভঙ্গিতে আজও সেই ইতালীয় শিকড়ের ছোঁয়া স্পষ্ট।
আর্জেন্টিনা হয়তো ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ, কিন্তু মানসিকভাবে তারা ইতালির সঙ্গে গভীর সূত্রে বাঁধা। তাই বিশ্বকাপে ইতালি না থাকলেও, অনেক ইতালীয় সমর্থকের হৃদয়ে কেন আর্জেন্টিনার জন্য আলাদা টান থাকে, তা এই ইতিহাস থেকেই বোঝা যায়। সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এমন এক মিলনমেলা বিশ্বে সত্যিই বিরল।



