মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে সম্প্রতি এক ফোনালাপে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়েছে, যা তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চলমান শান্তি আলোচনাকে গভীর সংকটে ফেলেছে। লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান নিয়ে দুই নেতার মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, যা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ফোনালাপের ঘটনা
সোমবার (১ জুন) অনুষ্ঠিত ওই ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন এবং তার প্রতি ‘অকৃতজ্ঞতার’ অভিযোগ তোলেন। বুধবার (৩ জুন) সম্প্রচারিত ‘পড ফোর্স ওয়ান’ পডকাস্টে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি এ কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম। তবে আমি রাগান্বিত ছিলাম না, বরং লেবাননে তার নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মনোভাবে কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলাম।” ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, তিনি নেতানিয়াহুকে পছন্দ করেন এবং তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ভালো।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এই টানাপোড়েনের খবরকে মৃদুভাবে উড়িয়ে দিয়েছেন। সিএনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, “একটি ভালো পরিবারেও মাঝেমধ্যে কৌশলগত মতবিরোধ হয়। আমরা সবসময়ই ভালো বন্ধু হিসেবে এগুলো সমাধান করে নিই।” তিনি মন্তব্য করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সকালে কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলেও বিকালের মধ্যেই তা মিটে যায়।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ফোনালাপের নেপথ্যে রয়েছে ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের সামরিক লক্ষ্যের ভিন্নতা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলার প্রায় ১০০ দিন পার হওয়ার পর এই দূরত্ব স্পষ্ট হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসন যখন ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাড়াতে এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে, তখন ইসরাইল লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে নিরবচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি না হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইসরাইল ইস্যুতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক জাতীয় কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্ট গত মার্চ মাসে পদত্যাগ করে অভিযোগ তোলেন যে, ইসরাইলি লবির চাপেই যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নেতানিয়াহুর থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইতিহাস বলছে, নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। এর আগে বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা এবং জো বাইডেনের সঙ্গেও বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে তার তীব্র মতবিরোধ হয়েছিল। তবে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ককে বরাবরই সবচেয়ে উষ্ণ ধরা হতো এবং নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে বড় বন্ধু বলে আখ্যায়িত করে এসেছেন। বর্তমান এই ফোনালাপের তিক্ততা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এখন জোর আলোচনা চলছে।



