ইরান যুদ্ধ আরব দেশগুলোর মধ্যে স্বল্পপাল্লার এবং ড্রোন-প্রতিরোধী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক বাজারে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য নতুন এক সুযোগের দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে আঙ্কারার জন্য এই সুযোগ আমেরিকার তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ বা ‘থাড’ ব্যাটারি প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়, বরং আরব দেশগুলোর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক কম খরচের স্তরগুলোতে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করার জন্য।
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিদের তুরস্ক সফর
চলতি মাসের শুরুর দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের একদল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তুরস্ক সফর করেছিলেন। তারা তুর্কি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাররাহ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান তুরস্ক সফর করেন। সেখানে তারা তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সাহা ২০২৬ প্রদর্শনী ও চুক্তি
মে মাসের শুরুর দিকে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত সাহা ২০২৬ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রদর্শনীর পর এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। তুরস্কের অন্যতম বৃহত্তম এই অস্ত্রমেলায় ১২০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। এরদোয়ানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মেলা থেকে প্রায় ৮০০ কোটি (৮ বিলিয়ন) ডলারের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
ইরানের হামলা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতি বা দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। সেটি হলো, আমেরিকার তৈরি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোও সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বড় আকারের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে না।
গবেষকের মতামত
ইস্তাম্বুলের ইবনে হালদুন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর গালফ স্টাডিজ অ্যান্ড গ্লোবাল পলিসি’র গবেষক গোখান এরেলি বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরাক এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের মতো একক কোনও নিরাপত্তা প্রদানকারী দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে সন্তুষ্ট নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা তাদের অর্থনৈতিক পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যকরণের মতোই এখন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব এবং সংগ্রহের কৌশল উভয় ক্ষেত্রেই সক্রিয়ভাবে বৈচিত্র্য আনছে।’
ইরাকের উদ্যোগ
ইরাক ইতোমধ্যে এই পরিবর্তনে এগিয়ে আছে। বাগদাদ তুরস্কের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ২০টি তুর্কি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করছে। ইরাকের ডেপুটি আর্মি চিফ অব স্টাফ (অপারেশনস) লেফট্যানেন্ট জেনারেল সাদ হারবিয়া এই মাসের শুরুতে ‘সাহা ২০২৬’ মেলায় বলেন, ইরান যুদ্ধের সময় ইরাকের আকাশসীমা ‘ড্রোনে ছেয়ে গিয়েছিল’। তিনি এই চুক্তির মূল্য বা নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানালেও বলেন, ইরাক তুরস্ককে বেছে নিয়েছে, কারণ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ‘শীর্ষ মানের এবং কম খরচের’।
কোরকুট ইউনিটের চুক্তি
এই বিক্রির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তুর্কি প্রতিরক্ষা শিল্পের একজন ব্যক্তি বলেন, ইরাকের এই পরিকল্পনার মধ্যে ২০টি ‘কোরকুট’ বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট রয়েছে এবং এই বিক্রির ‘চুক্তি সম্পন্ন’ হয়ে গেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরাক এবং ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের কাছে আরও অস্ত্র বিক্রি হবে।
তুরস্কের আকর্ষণীয় বিকল্প
গবেষক এরেলি বলেন, ‘তুরস্ক নিজেকে একটি ক্রমবর্ধমান আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, কারণ এটি দ্রুত সরবরাহের সময়সীমা ও নমনীয় ক্রয় ব্যবস্থার পাশাপাশি কার্যক্ষেত্রে প্রমাণিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিতে পারছে। সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ উৎপাদনের সম্ভাবনা।’
প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদন
অনেক পশ্চিমা সরবরাহকারী দেশ যেখানে কঠোর পরিচালনগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর সীমিত রাখে, সেখানে তুরস্ক যৌথ উৎপাদন ও ব্যাপক প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনেক বেশি উন্মুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। তুরস্ক ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ২০২৩ সালে সৌদির রাষ্ট্রচালিত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান সামি তুরস্কের ড্রোন জায়ান্ট বায়কার, আসেলসান এবং রাষ্ট্রচালিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুতকারক রকেটসান-এর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি সই করে। এছাড়া আমিরাতের এজ গ্রুপ ২০২৩ সালে তুর্কি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর সঙ্গে ২৪টি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে তুর্কি ড্রোনে আমিরাতি যুদ্ধ উপকরণ বা পেলোড যুক্ত করতে বায়কারের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে।
তুরস্কের অস্ত্র রফতানি বৃদ্ধি
প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী হিসেবে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান এই আকর্ষণ বৈশ্বিক অস্ত্র রফতানিতে তাদের অবস্থানের বড় উত্থানেও প্রতিফলিত হচ্ছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি)-এর ২০২৬ সালের মার্চের অস্ত্র হস্তান্তর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২০২৫ মেয়াদে তুরস্ক বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম প্রধান অস্ত্র রফতানিকারক দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে। তুর্কি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল পাকিস্তান, যা তুরস্কের মোট রফতানির ১৬ শতাংশ। এরপরই রয়েছে আমিরাত (১২ শতাংশ) এবং ইউক্রেন (৮.৪ শতাংশ)।
তুরস্কের ড্রোন খাতের সাফল্য
কাতার ইউনিভার্সিটির রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর আলী বাকির বলেন, ‘তুরস্ক তাদের ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং সাঁজোয়া ব্যবস্থার মতো দ্রুতগতিতে তাদের উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে পারেনি বলে মনে হচ্ছে।’ তুরস্কের ড্রোন খাত অবশ্য অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দেশীয় প্রতিরক্ষা কর্মসূচি থেকে একটি বড় রফতানি শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির শীর্ষস্থানীয় ড্রোন প্রস্তুতকারক বায়কার-এর বৈদেশিক বিক্রি ২০২০ সালের ৩৬ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২০ কোটি (২.২ বিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে কাতারের কাছে প্রথম ড্রোন বিক্রির পর, তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী কোম্পানিটি এখন ৩৭টি দেশে ড্রোন রফতানি করে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তুর্কি প্রতিরক্ষা সূত্রটি জানায়, ‘যদি ইরান যুদ্ধ ২০৩০ সালের দিকে হতো, তবে আমরা কেবল কোরকুট এবং আলকা লেজারের মতো ক্লোজ-এনগেজমেন্ট অস্ত্রই প্রদর্শন করতাম না, বরং হিসার এবং সিপারের মতো বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রও প্রদর্শন করতে পারতাম, যা ততদিনে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলতো।’



