ভারতে তেলাপোকাকে প্রতীক বানিয়ে অনলাইনে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যঙ্গধর্মী রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। তারা অদ্ভুত হাস্যরসকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপ দিয়েছে।
উত্থান ও প্রভাব
ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির এই আকস্মিক উত্থানকে স্রেফ ইন্টারনেটের একটা তামাশা বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আত্মপ্রকাশের এক সপ্তাহের মাথায় দলটির ইনস্টাগ্রাম পেজের অনুসারী (ফলোয়ার) সংখ্যা ১ কোটি ৯০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ!
ঘটনার সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদেরকে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছিলেন। এই মন্তব্যের পিঠেই রসিকতা করে জন্ম নেয় এই ‘কাল্পনিক’ দল। পরদিনই অবশ্য প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন যে তাঁর মন্তব্য সব বেকার তরুণদের উদ্দেশে ছিল না, বরং জাল ডিগ্রি দিয়ে পেশায় ঢুকে পড়া মানুষের নিশানা করা হয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।
বেকারত্বের সংকট
ভারতের এই মুহূর্তে বেকারত্ব গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। ভারতের বেকারত্ব সমস্যার সমবণ্টন ঘটেনি, বরং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই সংকট অনেক বেশি তীব্র। দেশের গড় বেকারত্বের হারের সঙ্গে কেবল স্নাতকদের বেকারত্বের ডেটার যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, তা নিজেই এক বড় বিপন্নতার গল্প বলে।
সরকারের নিজস্ব সাময়িক শ্রমশক্তি জরিপ (পিএলএফএস) অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতের সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল মোটে ৩ দশমিক ১ থেকে ৩ দশমিক ২ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু মূল খবরের পেছনের এই চটকদার সংখ্যাটি আসলে একটি কাঠামোগত বৈপরীত্যকে আড়াল করে রাখে। কারণ, ২০২২-২৩ সালের পিএলএফএস এর রিপোর্ট বলছে, স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে চার গুণের বেশি!
তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব
বিশের কোঠার শুরুতে থাকা তরুণ স্নাতক, যাঁরা সাধারণত সদ্য শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তাঁদের প্রতি তিনজনের একজন বেকার। অর্থাৎ এই বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। নির্দিষ্ট কিছু সূচক অনুযায়ী সেখানে দেখা গেছে, স্নাতকদের বেকারত্বের হার ২৯ দশমিক ১ শতাংশ, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা মানুষের বেকারত্বের হারের (৩ দশমিক ৪ শতাংশ) চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশি!
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি
তা ছাড়া, একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে বাতিল করা হয়েছে ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি ২০২৬’। এ ঘটনার পর রাজস্থানের কোচিং হাব হিসেবে পরিচিত সিকারে বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়া প্রদীপ মাণিচ নামের ২৩ বছর বয়সী এক দিনমজুরের সন্তান আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাঁর পরীক্ষার খরচের জোগান দিতে পরিবারটি জমি বিক্রি করেছিল, ঋণের জালে জড়িয়েছিল। এটি ছিল প্রদীপের তৃতীয় প্রচেষ্টা। এই হতাশার গল্পও কিন্তু কেবল তার একক নয়।
২০২৪ সালেও বিহার পুলিশ অভিযোগ করেছিল, পরীক্ষার ২৪ ঘণ্টা আগেই ৩০ থেকে ৩২ লাখ টাকার বিনিময়ে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল এবং পরীক্ষার্থীদের দিয়ে উত্তর মুখস্থ করানো হয়েছিল। এরও আগে ছিল ‘ব্যাপম’(মধ্যপ্রদেশের পেশাদার পরীক্ষা বোর্ডের হিন্দি সংক্ষেপ) কেলেঙ্কারি: মধ্যপ্রদেশের ১৩টি ভিন্ন ভিন্ন পরীক্ষায় হওয়া এক বিশাল জালিয়াতি, যেখানে লাখ লাখ টাকায় মেডিক্যাল কলেজের আসন বিক্রি হয়েছিল।
একদিকে এই কাঠামোগত বেকারত্ব, অন্যদিকে সফল হওয়ার প্রতিটি চেনা পথের এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ব্যবস্থার প্রতি তীব্র ও স্থায়ী এক অনাস্থা তৈরির সব উপাদান বহু আগে থেকেই মজুত ছিল। যার ফলে প্রধান বিচারপতির মন্তব্য সেই বারুদে আগুন হিসেবে কাজ করেছে।
বিমানবিকীকরণ ও তকমাবাজি
মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করার, তথা ‘বিমানবিকীকরণ’-এর এই নোংরা খেলা ভারতে বহু আগে থেকেই চলে আসছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় ২০১৮ ও ২০১৯ সালে অমিত শাহর দেওয়া বেশ কিছু বক্তব্যকে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিজেপির তৎকালীন সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ দিল্লির এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারী আমাদের দেশে ঢুকে পড়েছে এবং উইপোকার মতো দেশকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।’ বহুস্থানে এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল।
২০১৯ সালের এপ্রিলে, লোকসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে এই ভাষাকে তিনি আরও ধারালো করে তোলেন: ‘অনুপ্রবেশকারীরা হলো বাংলার মাটির উইপোকা। বিজেপি সরকার একেকজন অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বের করবে এবং বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলবে।’
২০১৮ সালেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ থেকে এই শব্দগুলোর ব্যবহারে ‘উদ্বেগ’ জানানো হয়েছিল। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কেবল ওই বছরেই জনসমক্ষে ১ হাজার ৩১৮টি ঘৃণাত্মক বক্তব্য প্রদানের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশানা করে ‘উইপোকা’, ‘পরজীবী’, ‘পোকামাকড়’, ‘শূকর’, ‘পাগলা কুকুর’, ‘সাপের বাচ্চা’, ‘সবুজ সাপ’ও ‘রক্তচোষা জম্বি’র মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
এমনকি ২০২৫ সালে ‘বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার সময় দিল্লির বিজেপি সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলগুলো থেকে মুসলিমদের ইঁদুর, মশা ও শূকর হিসেবে চিত্রিত করে বিভিন্ন মিম ও কার্টুন ছড়ানো হয়েছিল।
মানুষকে বিভিন্ন প্রাণী বা কীটপতঙ্গের তকমা দেওয়ার এই কায়দা এখন আর কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর পরিধি আরও বিস্তার লাভ করেছে। বিভিন্ন সময় তথ্য অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, গবেষক বা নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের ‘আর্বান নকশাল’ বা ‘দেশবিরোধী বুদ্ধিজীবী’ তকমা দেওয়া হয়েছে। এই ‘আর্বান নকশাল’ তকমাটির মাধ্যমে সশস্ত্র বিদ্রোহ আর শান্তিপূর্ণ ভিন্নমতের মধ্যকার স্পষ্ট পার্থক্যটিকে এক ঝটকায় মুছে ফেলা হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতাতেও ‘তেলাপোকা’ তকমাকে দেখা যেতে পারে। কেবল সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতাবলম্বীরাই নন, এখন অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ও অসহায় নাগরিকেরাও ব্যবস্থার চোখে হয়ে উঠছেন স্রেফ ‘বাতিলযোগ্য’ এক গোষ্ঠী।
স্যাটায়ার ও কমেডির প্রতিরোধের জগৎ
সিজেপির এই উত্থানকে ভারতের রাজনৈতিক মিম, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি এবং ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের দীর্ঘদিনের পথচলার প্রেক্ষাপট থেকেও বুঝতে হবে। এর সবচেয়ে কাছাকাছি মিল খুঁজে পাওয়া যায় ‘হিউম্যানস অব হিন্দুত্ব’ নামের একটি ফেসবুক পেজের সঙ্গে, যার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে অনুসারী সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৭০০-রও বেশি।
পেজটির অ্যাডমিন শুরু থেকেই নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। পরবর্তী সময় তিনি জানান, ‘এক জাতীয়তাবাদী বন্ধুর সঙ্গে তীব্র ও বিরক্তিকর এক তর্কের পর’ তিনি এই পেজ খোলার সিদ্ধান্ত নেন, যেন ‘বন্ধুর সেই উদ্ভট যুক্তিগুলোকে সবার সামনে তুলে ধরা যায়।’ ২০১৭ সালের একটি সাক্ষাৎকারে অ্যাডমিন ব্যাখ্যা করেছিলেন, পেজটির লক্ষ্য ছিল মূলত মার্কিন ব্যঙ্গাত্মক পোর্টাল ‘দ্য অনিয়ন’-এর একটি দেশি সংস্করণ হওয়া: যার মূল হাতিয়ার ফেসবুকের মাধ্যমে সুপরিকল্পিত ব্যঙ্গবিদ্রূপ ছড়িয়ে দেওয়া, যার ‘লক্ষ্যবস্তু’ ছিল হিন্দুধর্ম নয়, বরং হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শ।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে হত্যা করা হয়েছিল সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট গৌরী লঙ্কেশকে। এই হত্যাকাণ্ডের পর পেজের অ্যাডমিন এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেন। বিদায়লগ্নে তিনি লিখেছিলেন, ‘গৌরী লঙ্কেশ বা আফরাজুল খানের মতো পরিণতি বরণ করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমার নেই। আসলে নিজের চেয়েও আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক এই সিজেপি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তবে একটি প্রাথমিক পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলনের রূপ ধারণ করার ধরনে এটি পূর্ববর্তী সব উদাহরণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনেক বেশি ধারালো।
সিজেপির অবস্থান
তার প্রতীকী তীব্রতা সত্ত্বেও সিজেপি কিন্তু প্রচলিত অর্থে কোনো বিপ্লবী আন্দোলন হয়ে উঠতে চায় না। দলটির প্রতিষ্ঠাতা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন যে তাঁদের এই উদ্যোগ কোনো সহিংস বা উগ্রপন্থী মডেলকে সমর্থন করে না। নেপাল কিংবা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ‘জেন জি’ গণ-অভ্যুত্থানের ছায়াও এটি নয়। জনসমক্ষে আসা তাদের ইশতেহার মূলত কাজের মর্যাদা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, তরুণদের প্রতিনিধিত্ব ও সরকারি নিয়োগব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দেয়।
এই কারণেই সিজেপিকে একটি প্রাথমিক পর্যায়ের সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা রাজনৈতিকভাবে সোচ্চার, ডিজিটালি সুসংগঠিত ও আবেগে চালিত। এটি মূলত মিম কালচার ও মূলধারার আন্দোলনের রাজনীতির মাঝামাঝি এক ক্রান্তিকালীন জায়গায় অবস্থান করছে।
ইশতিয়াক মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক



