বগুড়ার জালি টুপি বিশ্ব বাজারে, তাহফিজ টুপির ৫০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা
বগুড়ার জালি টুপি বিশ্ব বাজারে, আয় ৫০ কোটি টাকা

বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার গ্রামীণ নারীদের নিপুণ হাতে তৈরি জালি টুপি এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাদৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিযোগী হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরীম ব্যবহৃত ‘তাহফিজ টুপি’র বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই টুপির বাজার ৫০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

টুপি তৈরির প্রক্রিয়া ও জড়িতরা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়ার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের গৃহবধূ ও শিক্ষার্থীরা সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুপি তৈরি করেন। তারা রকমারি হাতের কাজ করে থাকেন, যেখানে সুতা ও ক্রুশ কাটার মিলিত বন্ধনে তৈরি হয় রং-বেরংয়ের টুপি। শিক্ষার্থীরা নিজের হাত খরচ জোগাতে এই কাজে অংশ নেয়। মাসে একজন টুপি তৈরি করে দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা বাড়তি আয় করতে পারেন।

গ্রাম ও পরিবারের সম্পৃক্ততা

শেরপুর উপজেলার কাশিয়াবালা, তালপুকুরিয়া, চকধলী, জয়লা-জুয়ান, জয়লা-আলাদি, কল্যাণী, চক-কল্যাণী ও গুয়াগাছী এবং ধুনট উপজেলার বোহালগাছা, চৌকিবাড়ি, ফড়িংহাটা, কুড়াহাটা, বিশ্বহরিগাছা, চাঁনদার, ভূবনগাতি, চালাপাড়া, পাঁচথুপি, থেউকান্দি ও বাটিকাবাড়ি—এই দুই উপজেলায় অন্তত ৩০ গ্রামের ৯০০ পরিবার এই টুপি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বেপারি রাজু আকন্দ জানান, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখ নারী এই পেশায় যুক্ত। ঈদকে সামনে রেখে আরও অনেক নারী ও পুরুষ এই কাজে যোগ দিয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রভাব

তৈরি টুপি দেশের সীমানা পেরিয়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান, দুবাই, কাতার, ভারতসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। বগুড়ার শেরপুরে তৈরি জালি টুপি বেশ কয়েকটি দেশে সুনাম কুড়িয়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে পাঁচ লাখের বেশি নারী শ্রমিক ও শিক্ষার্থী এবং প্রায় ২০০ ব্যাপারি জড়িত। বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়, যা দেশীয় অর্থনীতিকেও চাঙ্গা করে। তবে এ বছর সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় চাহিদামতো টুপি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

টুপি শিল্পীরা

শেরপুর উপজেলার খাঁনপুর ইউনিয়নের তালপুকুরিয়া গ্রামের শানু খাতুন, আলেয়া, মর্জিনা বিবি ছোটবেলা থেকেই টুপি বানানোর পেশায় যুক্ত। তাদের মতে, বাড়িতে কর্মহীন হয়ে বসে থাকার চেয়ে কিছু করা ভালো। বংশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখতেও অনেকে এই পেশায় আসছেন। ছাতিয়ানি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মিম সুলতানা, সাবিনা ইয়াসমিন, সুর্বনা ও শিউলি জানান, তারা লেখাপড়ার পাশাপাশি টুপি তৈরি করেন। দিনে একটি টুপি তৈরি করে ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি করেন। ৭৫ টাকার সুতা দিয়ে ৮-৯টি টুপি তৈরি হয়, যদিও আগে ৬০ টাকায় সুতা পাওয়া যেত।

গৃহবধূদের ভূমিকা

কাশিয়াবালা গ্রামের গৃহবধূ ফরিদা পারভিন, শিউলি খাতুন, রুমি, জোৎস্না, আছিয়া প্রমুখ জানান, সংসারিক কাজের ফাঁকে টুপি বানিয়ে ভালো আয় হয়। বিশেষ করে রমজান মাসে গ্রামে গ্রামে টুপি তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। গৃহবধূরা সবকিছু বাদ দিয়ে এই কাজে মন দেন। বাড়ির অন্যরাও সহযোগিতা করেন। বেপারিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুতা দিয়ে আসেন, পরে সুতার দাম কেটে বাকি টাকা দিয়ে টুপি কেনেন।

বিপণন ও চ্যালেঞ্জ

বেপারি সোহাগ মিয়া জানান, ঠিকমতো কাজ করলে দিনে চারটি টুপি বোনা সম্ভব। ৭৫ টাকার এক ববিন সুতা দিয়ে ১২টি টুপি তৈরি হয়, যা ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। বেপারিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুতার ববিন দিয়ে আসেন এবং তৈরি টুপি কিনে নেন। ১২টি টুপির সেট পাইকারি বাজারে ভালো দামে বিক্রি হয়, যা বিভিন্ন মুসলিম দেশে যায়।

বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি জুয়েল আকন্দ বলেন, টুপি বিক্রি করে প্রতি বছর ৫০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসে। করোনার কারণে ব্যবসা থমকে গেলেও ‘তাহফিজ টুপি’র চাহিদা বেড়েছে। বাজারে চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এই শিল্পে সরকারের কোনো অনুদান বা সহযোগিতা নেই। শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, অন্যথায় এই শিল্প ধ্বংস হবে এবং প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে।